রাজধানীর মিরপুরে নিজ বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মায়ের প্রতি অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে একে পারিবারিক মানসিক সমস্যা ও মায়ের অতিরিক্ত অন্তর্মুখী স্বভাবকে দায়ী করেছেন তাঁর ছোট ছেলে ও বুয়েট অধ্যাপক একেএম আশিকুর রহমান।
মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে এক বৃদ্ধার গলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ৩১ মে রাতে পুলিশ ওই বাসা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারটির ভূমিকা ও অবহেলা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে বুধবার (৩ জুন) গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন নিহতের ছোট ছেলে এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক একেএম আশিকুর রহমান। তিনি পরিবারকে জড়িয়ে ছড়ানো সব তথ্যকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন।
অধ্যাপক আশিকুর রহমান জানান, ২০০৮ সালে তাঁদের বাবা মারা যাওয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময় মা নূর জাহান বেগম তাঁর সঙ্গেই বসবাস করতেন। এমনকি করোনাকালেও তিনি মায়ের সব ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সাল থেকে মা তাঁর মেজো মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানার মিরপুরের ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করেন। ২০১৭ সালে বোন ফাতিমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি একাই মায়ের দেখাশোনা করছিলেন।
পারিবারিক মানসিক স্বাস্থ্যের একটি জটিল দিক তুলে ধরে এই বুয়েট অধ্যাপক জানান, তাঁর মায়ের দীর্ঘদিন ধরে তীব্র সন্দেহপ্রবণতা ছিল, যার সাথে মানসিক রোগ ‘সিজোফ্রেনিয়া’র উপসর্গের মিল রয়েছে। একইভাবে স্বামী হারানোর পর থেকে তাঁর বোন ফাতিমাও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত ও ভেঙে পড়েছিলেন। তবে সামাজিক ও পারিবারিক সংকোচের কারণে তাঁদের কাউকেই কখনো কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা করানো হয়নি।
বাসার চরম অস্বাস্থ্যকর ও বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তাঁর বোন মানসিক সমস্যার কারণে বাইরে থেকে কোনো গৃহকর্মী বা কাজের লোক বাসায় রাখতে চাইতেন না। তিনি নিজে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়ে সহায়তার চেষ্টা করলেও তা স্থায়ী হয়নি; কারণ তাঁর মা-ও নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বাইরের অন্য কারও হস্তক্ষেপ বা প্রবেশ পছন্দ করতেন না। ঘটনার দিন (৩১ মে) বিকেলে বোন ফাতিমা ফোন করে মায়ের কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ার কথা জানালে, তিনি নিজেই দ্রুত সেখানে যান এবং নার্স ডাকা ও পুলিশকে খবর দেওয়াসহ পরবর্তী সব আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
অবশ্য মরদেহ উদ্ধার প্রক্রিয়ার সময় উপস্থিত থাকা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামছুর রহমান দাবি করেছিলেন, ফ্ল্যাটটি সম্পূর্ণ বসবাসের অনুপযোগী ছিল এবং উদ্ধারের সময় বৃদ্ধার ডান চোখ ও পিঠে পোকা ধরেছিল। তবে বুয়েট অধ্যাপক আশিকুর রহমান মায়ের শরীরে পোকা থাকার এই দাবিটি জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন।
এদিকে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বশির ঘটনার লোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে জানান, বৃদ্ধা নূর জাহান বেগম তাঁর মেয়ের ফ্ল্যাটের একটি পৃথক কক্ষে একা থাকতেন। রবিবার মেয়ে ফাতিমা তাঁর মাকে ডাকতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে একপর্যায়ে একজন নার্স ডেকে আনেন। ওই নার্স কক্ষে প্রবেশ করে দেখতে পান যে বৃদ্ধা বেশ কয়েকদিন আগেই মারা গেছেন এবং শরীরে মারাত্মক পচন ধরে মাংস গলে বিছানায় খসে পড়েছে। পরে স্থানীয় প্রতিবেশীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল দিলে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ওসি আরও উল্লেখ করেন, মায়ের মরদেহ ঘরের ভেতর পচে দুর্গন্ধ ছড়ালেও মেয়ে ফাতিমা নাকে কোনো গন্ধ পাননি বলে পুলিশকে জানিয়েছেন, যা তদন্ত কর্মকর্তাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এই মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



