দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন সক্ষমতা থাকার পরও বিতরণ ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা ও কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।আজ শুক্রবার রাজধানীর আফতাবনগরে অবস্থিত জাতীয় লোড ডেসপাচ কেন্দ্র (এনএলডিসি) পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দেশের বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এসব কথা বলেন। জ্বালানিমন্ত্রী স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত সরকারের আমলে অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে বিতরণ লাইন সম্প্রসারণ করার কারণেই বর্তমান জনগণকে এই খেসারত দিতে হচ্ছে। একটি স্থিতিশীল ও মানসম্মত বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—এই তিন খাতের সমান্তরাল ও সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু অতীতে রাজনৈতিক বা অন্যান্য কারণে বিদ্যুৎ খাত সম্প্রসারণ করা হলেও কোনো সমন্বিত দূরদর্শী পরিকল্পনা ছিল না, যার ফলে এই তিন খাতের মধ্যে এখন বড় ধরনের ব্যবধান ও সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আরও জানান, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় বড় কোনো ঘাটতি বা সংকট নেই। কিন্তু বিতরণ পর্যায়ের নানা কারিগরি সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক এলাকায় গ্রাহকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ বা গ্রাহকরা এসব ঘটনাকে লোডশেডিং মনে করলেও মূলত অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে বিতরণ লাইনের ভয়াবহ কারিগরি ত্রুটি ও ওভারলোড কাজ করছে। বিগত সরকার প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার রাজনৈতিক উদ্যোগ নিলেও সে সময় লাইন টানার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি মানদণ্ড ও প্রকৌশল পরিকল্পনাকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেয়নি। একটি আদর্শ ও বৈজ্ঞানিক বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা উচিত হলেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অনেক লাইন ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থায়ী দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, যা শুধু স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা করছে না, বরং পুরো বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনেও পড়ছে।
বিতরণ ব্যবস্থার এই তীব্র সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের টেকসই উপায় খুঁজতে তিনি ইতিমধ্যেই পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠক সম্পন্ন করেছেন বলে জানান। একই সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা এবং নতুন বিদ্যুৎ উৎসগুলোকে জাতীয় গ্রিডে নিরাপদভাবে যুক্ত করার প্রস্তুতিও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে আগামী আগস্ট মাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার কথা বলা হলেও পুরো বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে আরও কিছু বাড়তি সময় লাগবে। সেই বাস্তবতার কারণে আগামী নভেম্বরের মধ্যে এই পরমাণু বিদ্যুৎ ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গ ও বাণিজ্যিকভাবে চালুর সংশোধিত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবশেষে বিগত সরকারের আমলে করা বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি এবং বিতর্কিত ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ওপর একটি বড় ধরনের আর্থিক বোঝা ও ঋণের পাহার সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে এই চুক্তিগুলো আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় হওয়ায় বর্তমান নতুন সরকার চাইলেই হুট করে তা বাতিল বা একতরফা বন্ধ করতে পারে না। বর্তমানে দেশের আইন মন্ত্রণালয় এই চুক্তিগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা ও ধারাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছে। আইনগত কোনো ফাঁকফোকর বা সুযোগ থাকলে জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদ্যমান চুক্তিগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলে আইনি ও কারিগরি সব দিক সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে, কারণ তড়িঘড়ি করে কোনো চুক্তি বাতিল বা বড় সিদ্ধান্ত নিলে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।



