বিশ্ববাজারে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা এবং ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত সোনার দামে বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে।সাধারণত যেকোনো বৈশ্বিক সংকটের সময়ে বিনিয়োগকারীরা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকলেও এবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার ওপর চাপ তৈরি হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে গত ২৮ জানুয়ারি প্রতি আউন্স সোনার দাম সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে পৌঁছালেও সর্বশেষ শুক্রবারে (১২ জুন) তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে এসেছে।
সোনার দামের এই ধারাবাহিক পতনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতিকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে, যা তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রধান রুট বিঘ্নিত করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে, যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশটির শ্রমবাজার স্থিতিশীল থাকায় বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সোনা যেহেতু একটি সুদবিহীন বা নিয়মিত লভ্যাংশহীন সম্পদ, তাই সুদের হার বেশি থাকলে মানুষ ডলারে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয় এবং সোনার প্রতি আকর্ষণ হারাতে শুরু করে।
আর্থিক ওয়েবসাইট অপশনস্প্রিডার্স.কম-এর প্রধান অপশন বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, সোনা কোনো লভ্যাংশ দেয় না এবং মানুষ কেবল এর মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণেই এটি কেনে, তাই সুদের হার সরাসরি সোনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। অন্যদিকে নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লুম আল জাজিরাকে ই-মেইলে জানান, ইরান যুদ্ধের কারণে ডলার শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় সোনা চাপে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর আহ্বান জানালেও বর্তমানে সিএমই ফেডওয়াচ টুলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৫০ শতাংশেরও বেশি। কলিন প্লুমের মতে, ২০২৬ সালের বিশেষ চ্যালেঞ্জ হলো সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি দুটিই একই সঙ্গে ঘটছে এবং বর্তমানে সুদের হারের দিকটাই বাজারে প্রাধান্য পাওয়ায় সোনা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তবে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে সোনার দাম আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেড়ে দিন শেষ করেছে, কারণ যুদ্ধ শেষ হলে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।



