তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসন ও মারাত্মক আসক্তি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে প্রচলিত তামাকবিরোধী আইনকে আরও শক্তিশালী ও কঠোর করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।সোমবার (১৫ জুন) সকালে রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তামাক ব্যবহারের নানাবিধ ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, তামাক একটি অত্যন্ত মারাত্মক আসক্তি এবং এটি মানুষের শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যাকে আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত করে না। বর্তমান প্রচলিত আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর গলে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, সমাজকে এই বিষাক্ত থাবা থেকে বাঁচাতে আইনকে আরও শক্ত করা সময়ের দাবি। ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, যারা ধূমপান করেন তারাই এর সবচেয়ে বড় সাক্ষী হতে পারেন যে এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতখানি ক্ষতিকর। তামাক মানুষের স্বাভাবিক ঘুম নষ্ট করে, ক্ষুধা কমিয়ে দেয় এবং শরীরের ওজন দ্রুত হ্রাস করে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে মানুষের গালে ও দাঁতে মরণব্যাধি ক্যানসার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দেশের যুবসমাজ তামাকের হাত ধরে ধীরে ধীরে অন্যান্য মারাত্মক ও অনৈতিক নেশার দিকে ধাবিত হচ্ছে বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ই-সিগারেট নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, এই বিষয়ে বর্তমানে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং পরবর্তীতে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানানো সম্ভব হবে।
একই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সামগ্রিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রতিটি নাগরিকের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কেউ যদি কোনো প্রকার অনিয়ম, দুর্নীতি বা অবহেলা করার দুঃসাহস দেখায়, তবে তাকে অবশ্যই কঠিনতম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। সম্প্রতি মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে নেওয়া চরম ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির অমানবিক সেবার কারণেই মূলত লাইসেন্স বাতিল করে হাসপাতালটি সম্পূর্ণ বন্ধ করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তবে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজটি বন্ধ করা হয়নি, সেখানকার শিক্ষার্থীরা চাইলে অন্য নির্ধারিত হাসপাতালে তাদের নিয়মিত চিকিৎসাবিদ্যা অনুশীলনের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।
আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন যে, দেশজুড়ে হামের টিকাদানে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ শতভাগ সার্থক ও সফল হয়েছে। তিনি জানান, পুরো দেশে নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার আগে থেকে প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি ডেকে এবং বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে এবং সরকারের নিয়মিত বর্ধিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি চলমান রয়েছে। হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন যে, হামের মতো রোগ দেশ থেকে একেবারে উধাও বা শেষ হয়ে যাবে না। গত পরশু দিনে দেশজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৭০০ জন থাকলেও গতকাল তা বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজারে উন্নীত হয়েছে। অনেক সময় সাধারণ জ্বর হলেও মানুষ অসচেতনতার কারণে হামে আক্রান্ত হয়। গত এক সপ্তাহে দেশজুড়ে হামে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় ছিল, তবে দুই-একজন যে বিচ্ছিন্নভাবে মারা যাচ্ছে না, তা নয়। গত ২০ তারিখে শিশুদের যে টিকা দেওয়া হয়েছে, মানবশরীরে তার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হতেও কমপক্ষে এক মাস সময় লাগে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে যদি সময়মতো ডাক্তার ও নার্সরা হাসপাতালে আন্তরিক সেবা না দিতেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও টিকা নিশ্চিত করা না যেত, তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপ হতে পারত। এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় অন্য অতিথিদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন।



