ফরিদপুর সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক প্রায় দুই যুগ ধরে কাঁচা ও বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকায় অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।সোমবার, পনেরো জুন দুপুরে ফরিদপুর সদর উপজেলার কছিমউদ্দিন বেপারীর ডাঙ্গী এলাকায় এই সড়কটি দ্রুত মেরামত ও পাকাকরণের দাবিতে বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তীব্র রোদের মধ্যে আয়োজিত এই প্রতিবাদী মানববন্ধনে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কয়েক শত নারী ও পুরুষ সশরীরে অংশ নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মানববন্ধনে উপস্থিত বক্তারা অভিযোগ করে জানান, মমিনখার হাট-গোয়ালন্দ আঞ্চলিক সড়কের ইয়াছিন ব্রিজ থেকে শুরু করে দেলোন মল্লিকের ডাঙ্গী জামে মসজিদ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি কছিমউদ্দিনের ডাঙ্গী, মিনাজউদ্দিন মোল্যার ডাঙ্গী, আনছার মাতুব্বরের ডাঙ্গী, মগরম মাতুব্বরের ডাঙ্গী, নিমাই শেখের পাড়া, দেলোন মল্লিকের ডাঙ্গী ও বাজু মোল্যার ডাঙ্গীসহ প্রায় ১০টি জনবহুল গ্রামের মানুষের একমাত্র যাতায়াত পথ। এছাড়া স্থানীয় চরমাধবদিয়া ময়েজউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহার করেই অত্যন্ত কষ্ট করে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই জনপদের সড়কটি চরমভাবে উন্নয়নবঞ্চিত করে রাখা হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শনে দেখা গেছে, সড়কটির অধিকাংশ অংশই মারাত্মকভাবে ভাঙাচোরা এবং বড় বড় খানাখন্দে ভরা। মাটির এই রাস্তার অনেক জায়গায় দুই পাশ ধসে গিয়ে সরু হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো সড়কটি পিচ্ছিল ও কাদাময় হয়ে পড়ে, আর বর্ষা মৌসুমে রাস্তার অনেকাংশ সরাসরি পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে এই পথ দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল প্রায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গ্রামে কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। তখন বাধ্য হয়ে রোগীকে ভ্যান কিংবা কাঠের চৌকিতে শুইয়ে কাঁধে বহন করে মূল সড়কে নিয়ে যেতে হয়। কৃষকদের ক্ষেতের উৎপাদিত ফসল বাজারে বা বাড়িতে আনতেও চরম কষ্ট পোহাতে হয় এবং প্রায়ই পণ্যবাহী ভ্যান উল্টে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা জলিল শেখ আক্ষেপ করে বলেন, রাস্তাটির এমন করুণ অবস্থা হয়েছে যা মুখে বলার মতো না, এতদিন পার হলেও কোনো জনপ্রতিনিধি বা কর্মকর্তা তাদের খোঁজ নেয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অনেক সরকার এসেছে এবং গেছে কিন্তু তাদের রাস্তার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি; কয়েকবার কাজের সরকারি উদ্যোগ এলেও শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য রাজনৈতিক কারণে বরাদ্দ অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
একই এলাকার সৌদি প্রবাসী আব্দুর রাজ্জাক শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত ১৭ বছর ধরে তারা শুনে আসছেন এই এলাকার মানুষ ক্ষমতাসীন দলকে ভোট দেয় না, তাই এখানে কোনো সরকারি উন্নয়ন করা হবে না। এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে রাস্তাটি আজ পুরো জেলার অন্যতম একটি খারাপ ও মরণফাঁদ সড়কে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজের কষ্টার্জিত অর্থায়নে সড়কটির বিভিন্ন অংশ আংশিক মেরামত, একটি কালভার্ট নির্মাণ এবং এলাকার মানুষের জন্য একটি মসজিদ তৈরি করে দিয়েছেন। এমনকি সম্প্রতি ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজস্ব অর্থ খরচ করে প্রায় দুইশত মিটার সড়কে ইট বিছিয়েছিলেন, তবে ভারী বৃষ্টিতে সেটিও ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বক্তারা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্যের কাছে দ্রুত এই সড়কটি সংস্কার ও পাকাকরণের জন্য জোর দাবি জানান। মানববন্ধনে জনদাবি তুলে ধরে আরও বক্তব্য দেন জাহিদ ব্যাপারী, মোতালেব শেখ, মো. বাদশা মন্ডলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে একটি নিরাপদ ও টেকসই সড়কে যাতায়াত করার মৌলিক অধিকার তাদের রয়েছে এবং তারা আশা করেন দীর্ঘদিনের এই অবহেলার অবসান ঘটিয়ে প্রশাসন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে।



