প্লাস্টিক পণ্যের তীব্র আধিপত্য ও সহজলভ্যতার মুখে নাটোরের লালপুর উপজেলার কারিগরপাড়া গ্রামে ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব বাঁশশিল্পের চরম বিপর্যয় ঘটলেও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে এই পেশাকে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছেন জেলেখা বেওয়াসহ অল্প কিছু প্রান্তিক কারিগর।নাটোরের লালপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গ্রাম কারিগরপাড়া। একসময় এই গ্রামের প্রায় পাঁচশত পরিবার বাঁশের তৈরি বিভিন্ন পণ্য, বিশেষ করে ফল ও সবজি বহনের ঝুড়ি তৈরির পেশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। তখন গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকেই দিন-রাত বাঁশের চটা কাটা এবং ঝুড়ি বোনার খটখট শব্দ শোনা যেত। তবে আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতা এবং কম মূল্যের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই বাঁশপণ্যের কারিগরেরা আজ বাজার হারিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। কালের বিবর্তনে পাঁচশত পরিবার থেকে কমতে কমতে এখন এই গ্রামে মাত্র বিশটি পরিবার কোনো রকমে এই আদি পেশা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যে কয়েকজন কারিগর আজও টিকে রয়েছেন, সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা জেলেখা বেওয়া তাদেরই একজন। প্রায় ত্রিশ বছর আগে স্বামী রিয়াজ উদ্দিনের মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মুখে পড়েন ভূমিহীন জেলেখা বেওয়া। মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো জমি বা স্থায়ী আস্তানা না থাকায় তিনি বেঁচে থাকার তাগিদে এবং সন্তানদের মুখে অন্ন জোগাতে তাদের পারিবারিক পেশা বাঁশের ঝুড়ি তৈরিকে বেছে নেন। প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি করে নিজের হাতে তৈরি এসব ঝুড়ি স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি করে যা সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে চলে তাঁর সংসার। তবে বর্তমান বাজারে বাঁশপণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় সেই আয় দিয়ে তাঁর ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলেখা বেওয়া গভীর হতাশা নিয়ে জানান, সারাদিন বসে অত্যন্ত কষ্ট করে ঝুড়ি বানালেও বাজারে এখন বিক্রি অনেক কম, যার কারণে ঠিকমতো দুবেলা খাবার জোগানোও তাঁর জন্য দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
কারিগরপাড়ার বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয় কারিগর মানিক আক্ষেপ করে জানান, এই ঝুড়ি তৈরি শুধু তাদের রুজি-রুটির মাধ্যম নয়, এটি মূলত তাদের পূর্বপুরুষের আসল পরিচয়; কিন্তু কাজ ও বাজারে পণ্যের চাহিদা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় এখন টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। একই গ্রামের আরও দুই কারিগর সেন্টু ও রন্টু বলেন, বাজারে আগের মতো এখন আর বাঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা নেই, ফলে আয় কমে যাওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ পৈত্রিক পেশা পরিবর্তন করে অন্য কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন। তবে স্থানীয় প্রবীণ কৃষক আব্দুর রশিদ মাস্টার এই শিল্পের উপকারিতা তুলে ধরে বলেন, বাঁশের তৈরি ঝুড়িতে ফল রাখলে তা দীর্ঘক্ষণ ভালো থাকে এবং প্রাকৃতিক উপায়ে বাতাস চলাচল করতে পারে বলে ফল সহজে নষ্ট বা পচে যায় না; কিন্তু আধুনিক যুগের মানুষেরা এখন দেদারসে প্লাস্টিক ব্যবহার করছে, যা পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকর। স্থানীয় ফল ব্যবসায়ীদের মতে, বছরের অন্যান্য সময়ে মন্দা থাকলেও প্রতিবছর গ্রীষ্ম মৌসুমে এই বাঁশশিল্পে কিছুটা প্রাণ ফিরে আসে। বিশেষ করে আম ও লিচুর বাণিজ্যিক মৌসুমে বাগান থেকে ফল সংগ্রহ এবং পরিবহনের জন্য বাজারে বাঁশের ঝুড়ির চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। কৃষকেরা গাছ থেকে তাজা ফল সংগ্রহ করে এই ঝুড়িতে করেই পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়ে যান।
বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান ডক্টর ফয়েজ উদ্দিন মিয়া এই লোকশিল্পের গুরুত্ব নিয়ে বলেন, বাঁশের ঝুড়ি কেবল বিক্রির কোনো সাধারণ পণ্য নয়, এটি আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বর্তমান সময়ে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে বাঁশের মতো প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি ও সময়ের দাবি। লালপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় এই শিল্পের বৈজ্ঞানিক উপযোগিতা ব্যাখ্যা করে বলেন, বাঁশের তৈরি ঝুড়ি পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না এবং ফল দীর্ঘক্ষণ সতেজ রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এটি পরিবহনের সময় ফলের বাহ্যিক ক্ষতি ও পচন অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই গ্রামীণ শিল্পকে পুরোপুরি বিলুপ্তির হাত থেকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখন সরকারি আর্থিক সহায়তা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। লালপুর উপজেলা সহকারী পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মৃদুল রায় কারিগরদের পুনর্বাসন ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়ে বলেন, প্রান্তিক কারিগরদের আধুনিক কাজের উপযোগী প্রশিক্ষণ, জামানতবিহীন সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এর পাশাপাশি গ্রামীণ তরুণ ও নতুন প্রজন্মকে এই সম্ভাবনাময় পেশায় আগ্রহী করে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।



