নোয়াখালীর চাটখিল পৌরসভার ভীমপুর গ্রামের বেদেপল্লিতে সরকারি খাস জায়গায় গড়ে তোলা একটি কুঁড়েঘরে এসি ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে ববিতা আক্তার সুমাইয়া নামের এক নারী দীর্ঘদিন ধরে বেপরোয়া মাদক ও নারী ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
নোয়াখালীর চাটখিল পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভীমপুর গ্রামের বেদেপল্লির সরকারি খাস জায়গায় বাইরে থেকে দেখতে একটি সাধারণ ঝুপড়ি ঘর তৈরি করা হয়েছে। তবে এই কুঁড়েঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সেখানে বিলাসবহুল আস্তানার ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে এয়ারকুলার এবং পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণের জন্য বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্রেতাদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখার জন্যই প্রযুক্তির এই অপব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই রাজকীয় আস্তানাটির মূল হোতা ববিতা আক্তার সুমাইয়া নামের ৩৫ বছর বয়সী এক নারী, যিনি বেদে পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাদককারবার পরিচালনা করে আসছেন।
তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এই অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এক সময় আওয়ামী লীগের নেতাদের সহযোগিতায় এই ব্যবসা শুরু করলেও বর্তমানে বিএনপির কিছু নেতার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে তিনি তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। চাটখিল থানা পুলিশ কয়েক দফায় তাকে ইয়াবাসহ আটক করে আদালতে পাঠালেও প্রতিবারই জামিনে বের হয়ে তিনি পুনরায় একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এই আস্তানায় মাদকের পাশাপাশি জমজমাট নারী ব্যবসাও চলছে। এলাকার বাইরে থেকে যেমন বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী, চন্দ্রগঞ্জ থানা এলাকা এমনকি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ থানা এলাকা থেকেও প্রচুর খদ্দের এই আস্তানায় যাতায়াত করে। এর ফলে এলাকার উঠতি বয়সের কিশোর ও যুবসমাজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চাটখিল থানা পুলিশ এই মাদক রানীর কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক টাকা নেয়। একবার এলাকার পক্ষ থেকে পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করায় তৎকালীন শাসক দলের ক্যাডারদের হাতে কয়েকজন এলাকাবাসীকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল। এই মাদক সিন্ডিকেটের কারণে চাটখিলের ছাত্র ও যুবসমাজ চরমভাবে বিপথগামী হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে এই অবৈধ আস্তানা উচ্ছেদের জোর দাবি জানিয়েছেন। চাটখিল পৌরসভা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বিকে হানিফ জানান, এই মাদককারবারির কাছে পুলিশ, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষ সবাই অসহায়। পুলিশ বা বহিরাগত কারও উপস্থিতি টের পেলেই তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দলবেঁধে হামলা করতে আসে। তিনি ববিতার এই ক্ষমতার উৎস খুঁজে বের করে তার সহযোগীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ববিতা আক্তার সুমাইয়ার বিরুদ্ধে থানায় মোট সাতটি মাদক মামলা রয়েছে এবং এ পর্যন্ত তিনি ছয়বার পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। তবে প্রতিবারই জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় একই কর্মকাণ্ড শুরু করেন। তাকে আটক করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়রা হামলার শিকার হয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে ববিতা আক্তার সুমাইয়ার ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে এক মাদকসেবীর ফোন থেকে কল করে সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি অত্যন্ত অসভ্য ভাষায় চিৎকার করে হুমকি দেন। তিনি বলেন যে টাকা বা মেয়ে লাগলে পৌঁছে দেওয়া যাবে, কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করলে নারী নির্যাতন ও মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হবে। থানা এবং কোর্ট উভয় জায়গাতেই তার সব সময় মামলা প্রস্তুত থাকে। একই সাথে তিনি তার বিরুদ্ধে বা তার আশেপাশে কাউকে না লাগার জন্য সাবধান করে দেন। চাটখিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মোন্নাফ জানান, ওই নারী একজন বেপরোয়া মাদককারবারি। তাকে অনেকবার ধরে চালান দেওয়া হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি জায়গা দখল করতে না পেরে এখন তিনি নতুন করে এই ঘর উঠাচ্ছেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসার পর তার বিরুদ্ধে দুটি মাদকের মামলা দেওয়া হয়েছে। তবে তার এমন বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং ঘরে এসি ও সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার বিষয়টি পুলিশের জানা ছিল না। পুলিশ এই বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে।



