পিরোজপুরের ঐতিহাসিক রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি আজও বহন করে চলেছে প্রায় সাড়ে চারশ বছরের ইতিহাস, যা মোঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে ১৬০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত হয়েছিল।
পিরোজপুর শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে রায়েরকাঠি গ্রামে প্রায় সাড়ে তিনশ একর জমির উপর এই রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন মোঘল আমলের ভাটিয়াল রাজা রুদ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী। একসময় এই জমিদার বাড়িতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০০টি স্থাপনা ছিল। ইট-সুরকির নিখুঁত কারুকাজে নির্মিত রাজভবন, নহবৎখানা, অতিথিশালা, মঠ, পূজামণ্ডপ, কাচারিঘর, অন্ধকূপ, পাঠশালা, ঘোড়াশালা ও হাতিশালা এখানকার জমিদারি ব্যবস্থার সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। বর্তমানে অবহেলা আর অযত্নে রাজবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকলেও ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ এখনও অটুট রয়েছে।
এই রাজবাড়ির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো কষ্টি পাথরের তৈরি একটি বিশালাকার শিবলিঙ্গ, যার ওজন প্রায় ২৫ মণ। স্থানীয়দের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে যে, এটি উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ। এছাড়া প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো শনি মন্দির, কালী মন্দির এবং সুউচ্চ ১১টি মঠ এখনও অতীতের গৌরবের স্মৃতি বহন করছে, যার অধিকাংশই এখন ভেঙে গেছে। বর্তমানে এই রাজপরিবারের ৯ম প্রজন্মের উত্তরসূরী গৌর রায় চৌধুরীসহ মাত্র দুটি পরিবার এখানে বসবাস করছেন। প্রাচীন এই স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শতাধিক দর্শনার্থী রায়েরকাঠি জমিদার বাড়িতে আসেন। এখানে প্রতি বছর বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, রথযাত্রা এবং শিব পূজা অনেক বড় পরিসরে উদযাপিত হয়, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ সমবেত হন।
স্থানীয় বাসিন্দা সালাম সিকদার বলেন, এটি একটি ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি এবং এখানকার সাড়ে চারশ বছরের পুরোনো মঠ ও মন্দিরগুলো দেখতে মানুষ এখানে আসেন। সরকারিভাবে বাউন্ডারি দেয়াল দিয়ে এটি সঠিকভাবে দেখভাল ও মেরামত করলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি একটি দারুণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, যা থেকে সরকার অনেক রাজস্ব পাবে। স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী অনন্যা চ্যাটার্জি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এই ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে আসেন, ছবি ও ভিডিও করেন এবং এখানকার ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অংশ নেন। আরেক বাসিন্দা পান্না লাল রায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ির অবশিষ্টাংশও ক্রমাগত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং সবকিছু ভেঙে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিলে এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে এবং এলাকায় অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
রাজা রুদ্র নারায়ণের নবম প্রজন্মের উত্তরসূরি গৌর রায় চৌধুরী বলেন, এখনও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ উদ্যোগ নিলে মন্দির, পাঠশালা, অতিথিশালাসহ অন্যান্য স্থাপনার যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তা সংরক্ষণ করা সম্ভব। পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রশিদ এই বিষয়ে বলেন, রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান। বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকলেও এটি এখনও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এর সংরক্ষণের বিষয়ে দ্রুত প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে অবহিত করা হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।



