নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে ১০ বছর বয়সী এক অবুজ শিশু সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার লোমহর্ষক ঘটনায় স্থানীয় এক পৌর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে থানায় একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে।আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পর থানায় মামলাটি নিয়মিত হিসেবে রেকর্ড করা হলেও দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস সময় পেরিয়ে গেলেও মূল অভিযুক্ত আসামিকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ভুক্তভোগী অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণের মামলা দায়ের করার পর থেকেই মূল আসামী সম্পূর্ণভাবে আত্মগোপনে রয়েছেন। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ওই যুবকের নাম মোহন তালুকদার (২৫)। তিনি নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ পৌরশহরের অন্তর্গত দৌলতপুর এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদের ছেলে এবং মোহনগঞ্জ পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে রয়েছেন। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সম্মানিত আহ্বায়ক সোহেল রানা অভিযুক্ত মোহন তালুকদারের সুনির্দিষ্ট দলীয় পদের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আনীত এই জঘন্য অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলের পক্ষ থেকে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মামলার বিস্তারিত এজাহার, আদালতের নথি এবং ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুটফুটে শিশুটির বাবা নিজের ও পরিবারের জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় দিনমজুরের কাজ করে বেড়ান। আর শিশুটির মা স্থানীয়ভাবে লোকজনের বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে তিন কন্যাসন্তানকে নিয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে সংসার চালান। আনীত অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর দুপুরে শিশুটির মা প্রতিদিনের মতো কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে গেলে ঘরের ভেতর ওই শিশুটি এবং তার দুই ছোট বোন অবস্থান করছিল। ঠিক এই সুযোগে প্রতিবেশী লম্পট মোহন তালুকদার ফাঁকা ঘরে প্রবেশ করে অবুজ শিশুটিকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি পরিবারের কাউকে বা অন্য কাউকে জানালে শিশুটিকে প্রাণে মেরে ফেলাসহ দলবদ্ধ ধর্ষণের ভয়াবহ হুমকি দেওয়া হয়। যার ফলে চরম ভয়ে শিশুটি দীর্ঘ দিন ধরে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি নিজের মনের ভেতর গোপন করে রাখে।
ভুক্তভোগীর পরিবার আরও জানায়, চলতি ২০২৬ সালের ১২ মার্চ শিশুটি হঠাৎ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং তার শারীরিক অবস্থায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে মায়ের মনে তীব্র সন্দেহ জাগে। পরে মায়ের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শিশুটি কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং নিজের ওপর হওয়া ওই পাশবিক ধর্ষণের কথা স্বীকার করে। ঘটনার পরদিনই অর্থাৎ ১৩ মার্চ স্থানীয় একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে শিশুটির জরুরি আলট্রাসনোগ্রাফি করালে রিপোর্টের মাধ্যমে প্রথম জানা যায় যে সে ১৩ সপ্তাহের গর্ভধারণ করেছে। পরবর্তীতে গত ১৫ মার্চ অন্য আরেকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও পুনরায় পরীক্ষা করালে একই ধরনের রিপোর্ট আসে। সেই দিনই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে ভুক্তভোগী পরিবারটি মোহনগঞ্জ থানায় গেলে থানা থেকে প্রথমে আদালতে গিয়ে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে পরিবারটি। এরপর দরিদ্র পরিবারের লোকজন ও স্থানীয় সচেতন মহলের সাথে পরামর্শ করে শিশুটির মা বাদী হয়ে গত ২৮ এপ্রিল আদালতে একটি সুনির্দিষ্ট নালিশি অভিযোগ দায়ের করেন। পরবর্তীতে আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে মোহনগঞ্জ থানাকে দ্রুত মামলাটি রেকর্ড করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। আদালতের সেই আদেশের পর গত ২ মে ধর্ষণের অভিযোগে মামলাটি মোহনগঞ্জ থানায় অফিশিয়ালি রেকর্ড করা হয়।
ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারের অভিযোগ, থানায় মামলা হওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত পৌর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোহন তালুকদার এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও পুলিশ প্রশাসন তাকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। ভুক্তভোগী শিশুর মা অত্যন্ত আকুলভাবে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, তার মেয়েটি একদম ছোট মানুষ, সে এসবের কিছুই বোঝে না। অথচ তার পুরো সুন্দর জীবনটা এভাবে নষ্ট করে দেওয়া হলো। অনেক কষ্ট করে মামলা করলেও আসামী এখনও ধরা পড়েনি। তারা অত্যন্ত গরিব মানুষ বলেই হয়তো সমাজে বিচার পেতে এত কষ্ট হচ্ছে। তিনি তার মেয়ের জীবনের এই চরম অন্ধকারের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে ন্যায্য ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। এই বিষয়ে মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন সাংবাদিকদের বলেন, মামলা দায়ের হওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত আসামীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তবে পুলিশ আসামীকে গ্রেফতারের জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আশা প্রকাশ করছেন যে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হবেন।



