নারায়ণগঞ্জের রয়্যাল রিসোর্টের বহুল আলোচিত ৫০১ নম্বর কক্ষকে ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের পরাজয়ের দলিল’ এবং নিজেদের ‘বিজয়ের প্রতীক’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ফেসবুকে দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
নারায়ণগঞ্জের রয়্যাল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষটি নিয়ে দেশজুড়ে চলা দীর্ঘ বিতর্কের অবসান ঘটাতে ও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক একটি দীর্ঘ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। শনিবার (২০ জুন) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই কক্ষটিকে তাদের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ভবিষ্যতে এটি উদযাপন করার কথা জানান। মামুনুল হকের দাবি, ৫০১ নম্বর কক্ষটি ছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের একটি ব্যর্থ প্রজেক্ট, যার মাধ্যমে তাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ধ্বংস করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণাকে নিয়ে ওই কক্ষে অবস্থান করছিলেন। সে সময় পুলিশের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী, সাংবাদিক ও অন্যান্যরা জোরপূর্বক কক্ষে প্রবেশ করে বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করে তাদের চরমভাবে হেনস্তা করে। পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে তিনি স্ত্রীকে ওয়াশরুমে রাখলেও নারী পুলিশ সদস্যরা সেখানে ঢুকেও লাইভ সম্প্রচার চালান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা উভয়েই বৈবাহিক সম্পর্কের কথা স্পষ্টভাবে জানালেও প্রথমে পুলিশ তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং পরবর্তীতে ডিজিএফআই কর্মকর্তারা এসে তাদের থানায় নেওয়ার নির্দেশ দেন। রিসোর্টের বাইরে তখন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হলে তিনি নিজে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
জান্নাত আরার সঙ্গে বিয়ে প্রসঙ্গে পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, জান্নাত আরা আগে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন এবং তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। পরবর্তীতে পারস্পরিক সম্মতিতে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হলে একপর্যায়ে তিনি জান্নাত আরাকে শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে করেন। উপমহাদেশে একাধিক বিয়ে সামাজিকভাবে জটিল এবং রাষ্ট্রীয় আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টি জটিল হওয়ায় তিনি প্রথমে এই বিয়ে গোপন রেখেছিলেন। রিসোর্টে প্রথম স্ত্রীর নাম (আমিনা তাইয়েবা) ব্যবহারের ব্যাখ্যায় তিনি জানান, পরিচয়পত্রের জটিলতার কারণে আলোচনার ভিত্তিতে তারা সেটি করেছিলেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে কল রেকর্ড ফাঁস করার তীব্র সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, তিনি রাষ্ট্রীয় বা শরিয়তের কোনো আইন ভঙ্গ করেননি। রিসোর্ট ঘটনার পর তৎকালীন এনএসআই মহাপরিচালক তার সঙ্গে বৈঠক করে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আদালতে জান্নাত আরার ছেলে আব্দুর রহমানকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিতে বাধ্য করার চেষ্টা হলেও সে আদালতে প্রকৃত সত্য তুলে ধরায় সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। তার বিরুদ্ধে ওঠা ‘চুক্তিভিত্তিক’ বা ‘মুতা বিয়ে’র অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে তিনি জানান, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল এবং বিভিন্ন মনোমালিন্যের কারণে আলোচনার মাধ্যমে ২০২৫ সালের মার্চে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। দীর্ঘ পোস্টে চরিত্র হননের অভিযোগ তুলে তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা আল ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে তার বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণকারীদের বিরুদ্ধে ‘মুবাহালা’র (খোদার লানত বর্ষণের চ্যালেঞ্জ) আহ্বান জানান।
বিয়ের কাবিননামা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মাওলানা মামুনুল হক তার পোস্টে স্পষ্ট করে বলেন, “ইসলামে কাবিন বাধ্যতামূলক নয় এবং তার প্রথম বিয়েতেও কাবিন হয়নি। তবে তার একাধিক বিয়ের বিষয়টি ঘনিষ্ঠজনেরা জানতেন।” প্রথম স্ত্রীকে ফোনে জান্নাত আরাকে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী বলে পরিচয় দেওয়ার বিষয়ে তার ভাষ্য, “প্রথম স্ত্রী আগে থেকেই জান্নাত আরাকে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী হিসেবে চিনতেন। তাই বিষয়টি শান্তভাবে উপস্থাপনের জন্য তিনি সেই পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।” রয়্যাল রিসোর্টের কক্ষটি নিয়ে নিজের চূড়ান্ত অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি ঘোষণা করেন, “৫০১ তার কাছে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং এটি ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের পরাজয়ের দলিল। ৫০১ কে তারা বিজয়ের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করছেন এবং ভবিষ্যতে এটি উদযাপন করবেন।”



