ইউক্রেনের ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে রাশিয়ার নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে একটি তেল সংরক্ষণাগারে আঘাত হেনেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর মস্কো লক্ষ্য করে হওয়া সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি এবং এই ঘটনা রুশ সামরিক বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও কার্যকারিতাকে গভীর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভোরে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর ওপর ইউক্রেন এই দূরপাল্লার ড্রোন হামলাটি চালায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর রোববার (২১ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যাচাই করা ভিডিও ফুটেজের বরাতে জানানো হয়, হামলার সময় মস্কোর ব্যস্ত মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে রুশ সেনারা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ড্রোন লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিলেন, যার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, যার ফলে সব লক্ষ্যবস্তু একই সময়ে প্রতিহত করা রাশিয়ার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। হামলার সময় একটি ড্রোন জনবহুল এলাকার একটি ভবনে আছড়ে পড়ে এবং একটি রুশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়ে নিজেদেরই একটি তেল সংরক্ষণাগারে গিয়ে পড়ে। এতে সেখানে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং আকাশে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাকে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা “রাশিয়ার আত্মঘাতী গোল” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সিপ্রির গবেষক মার্কাস শিলার সিএনএনকে বলেন, রাশিয়ার পুরোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ নির্ভরযোগ্য নয় এবং অন্যদিকে ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে তাদের ড্রোন হামলার সক্ষমতা উন্নত করে আসছে। ২০২৪ সাল থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে তেল শোধনাগার, সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়ে এখন সেন্ট পিটার্সবার্গ ও মস্কোতেও আঘাত হানছে। ম্যাকেনজি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক স্টু রে বলেন, মস্কোর ঘটনায় রুশ বাহিনীর প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক, বিশৃঙ্খল ও অপেশাদার; ব্যস্ত সড়কে সামরিক অস্ত্র ব্যবহার এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাই তুলে ধরেছে।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক থমাস উইথিংটনের মতে, রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত যুদ্ধবিমান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার জন্য তৈরি হওয়ায় ছোট ও স্বল্পমূল্যের ড্রোন মোকাবিলায় এটি পর্যাপ্তভাবে উপযোগী নয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আধুনিক প্রযুক্তি সংগ্রহে রাশিয়া বাধার মুখে পড়েছে, যা নতুন ধরনের ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা সীমিত করে দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান এই ড্রোন হামলার প্রভাব রাশিয়ার অভ্যন্তরেও দৃশ্যমান হচ্ছে, যার ফলে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে মস্কোর রেড স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজও সীমিত পরিসরে আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলার মুখে রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনাকারীদের সামনে এখন সহজ কোনো সমাধান নেই; বরং ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার পথ খুঁজতেই তাদের বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে।



