সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তীর বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশ গঠনের হুঁশিয়ারি বক্তব্যকে দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকরা।
গত ১৯ জুন একটি বেসরকারি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তী মন্তব্য করেন, ‘আপনারা বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য চেয়ে আমরা সনাতনীদের জন্য আলাদা একটি প্রদেশ করব।’ তার এই বিতর্কিত বক্তব্যের পর দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, সরকারপ্রধানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে দেশে কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির লক্ষ্যে এটি একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর এজেন্ডা বাস্তবায়নে চৈতালীর মতো কিছু এজেন্টকে মাঠে নামানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনীতিকদের মতে, বাংলাদেশে ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করে আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করাই এই গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য। তবে বাংলাদেশের মানুষ এত সহজে বিভ্রান্ত হবে না বলে তারা বিশ্বাস করেন। এই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হওয়ায় অবিলম্বে চৈতালী চক্রবর্তীকে আইনের আওতায় এনে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। একই সাথে দেশের শীর্ষস্থানীয় হিন্দু নেতাদেরও এই ষড়যন্ত্রী বক্তব্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নেতৃবৃন্দ।
যুবদল সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না বলেন, ‘চৈতালী চক্রবর্তী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে যে আলাদা প্রদেশ গঠনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তা দেশের প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অবিলম্বে তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে ঘিরে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। এটা থেমে গেলে আবার হয়তো অন্য ফর্মে আসবে। চৈতালী বা এমন কিছু লোক তাদের প্রস্তুত করা আছে। তারা নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নামে। আক্রান্ত হওয়াই তাদের উদ্দেশ্য, যেন তাদের গ্রেপ্তার বা আঘাত করা হয়। বিজেপি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক ও উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতি ছড়িয়ে দিতে চায়। আদানি-আম্বানির স্বার্থ রক্ষার জন্য তারা ভারতের রাজনীতিতে এই মাফিয়াদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চায়। সেজন্য প্রতিবেশী দেশগুলোতে এ ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। কিন্তু দেশে বিজেপির বিরোধিতার নামে উগ্র সাম্প্রদায়িক ও ভারতবিরোধী রাজনীতির নামে বিজেপিকে সহায়তা করার মতো এক ধরনের শক্তি দাঁড়িয়ে গেছে। এত সহজে বাংলাদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে বারবার বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, মূর্তি ভাঙচুরের জন্য মিছিলের চেষ্টা করা হয়েছে। তাই সরকারের উচিৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড সাইফুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এমন বক্তব্য মানতে পারে না। বাস্তবে এটি ভারতের নরেন্দ্র মোদি, বিজেপি ও দেশটির হিন্দুত্ববাদীদের বাংলাদেশ বিদ্বেষী প্রচারণার অংশ। চৈতালী চক্রবর্তীকে আইনের আওতায় এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সুযোগ আছে। তবে দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতির জন্য বিপজ্জনক হলে তা গ্রহণের সুযোগ নেই।’
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘এ ধরনের উস্কানিমূলক কথাবার্তা মাঝে মাঝে বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আনা হয়। ভারতের বিজেপি সরকার নিজ দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে ভোটে সাফল্য পেয়েছে। ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে উস্কে দেওয়াই তাদের রাজনীতি। আওয়ামী লীগের বিপর্যয়ে তাদের মাথা ঠিক নেই। দল, মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উচিত এর প্রতিবাদ জানানো। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ বার্তা দিতে হবে।’
গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান বলেন, ‘দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা অরাজকতা, অস্থিতিশীলতা তৈরি করে তারা আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করতে চায়। তাদের দেখাতে চায়, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা শান্তিতে নেই। তাদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। চীন বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বর্তমান সরকারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভারত মেনে নিতে পারছে না।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘সরকারপ্রধানের চীন সফরকে কেন্দ্র করে এখানে ভারতপন্থি গোষ্ঠীগুলো নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবেই চৈতালী মাঠে নেমেছেন। নানাভাবে তারা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। কোন একটা সুযোগ পেলেই তার সদ্ব্যবহার করতে চায়। এ ব্যাপারে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে।’



