দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগসহ পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও বৈষম্যহীন করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সোমবার (২২ জুন) দুপুরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ডিনস ও ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, “আমরা মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করার জন্য সেখানে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করছি। আমরা কোনো বৈষম্য চাই না।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার ধাপে ধাপে সিলেবাস ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে। এর ফলে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডসহ মোট ১১টি বোর্ডে যেসব বিষয়ে পাঠ্যক্রম ও বিষয়বস্তু অভিন্ন, সেসব বিষয়েও একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হবে। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের মতো অভিন্ন বিষয়গুলোতে মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা ধারার শিক্ষার্থীরা একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেবে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট দূরীকরণ ও বাজেট বৃদ্ধি নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকসহ প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশ এবং পরবর্তী অর্থবছরে ৪ শতাংশ, আগামী চার বছরের মধ্যে ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।” দেশের ৬৫ হাজার ৫০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ আটকে থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “২০১৭ সালের একটি মামলার কারণে এটি আটকে আছে। এর ফলে বহু সহকারী শিক্ষক পদোন্নতির সুযোগ না পেয়েই অবসরে যাচ্ছেন। আমি সংসদে বলার পর সেটি আদালতের নজরে এসেছে। ২ জুলাই এটি সমাধান হবে। জটিলতা নিরসন হলে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে আরও ৫০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।”
শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, শিক্ষকদের বদলি এবং বকেয়া বেতন প্রসঙ্গে মন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান যে, মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করার লক্ষ্যে সেখানে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে সাজানোর কাজ চলছে। শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়া সহজ করতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কর্মরত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা আগামী ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করা হবে। এ ছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষকদের মে ও জুন মাসের বকেয়া বেতন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার ব্যবস্থার ডাটাবেজসংক্রান্ত জটিলতার কারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সরকার দ্রুত এ জটিলতা নিরসনে কাজ করছে।” উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, “আমরা গত সপ্তাহে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস করেছি। সেখানে নতুন নতুন বিষয় থাকবে। এই প্রথম ইউরোপ-আমেরিকার মতো একটি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। নোয়াখালীতেও এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে বগুড়ার পর নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিকায়ন করার প্রস্তাব আমরা পাবো বলে আশা করি।”
এর আগে সকালে বর্ণিল আয়োজনে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে কেক কেটে, পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে এবং বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বের জন্য ৫১ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হাতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার ও অ্যাওয়ার্ড তুলে দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৪৯ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’ এবং তিনটি ক্যাটাগরিতে তিনজনকে ‘ভাইস-চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়। এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী, জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার এন এম নাসির উদ্দিন, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।



