লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে মা ও তাঁর তিন মেয়েকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে এবং পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে অভিযুক্ত ঘাতক যুবকও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার আমির হোসেন মাস্টারের ভাড়া বাসায় এই ভয়ংকর ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন—মা শাহিনুর বেগম (৩৮), তাঁর বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। ধারালো অস্ত্রের উপুর্যপুরি আঘাতে আক্রান্তদের উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মা শাহিনুর, বড় মেয়ে সায়মা ও ছোট মেয়ে শিফাকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে গুরুতর আহত মেজ মেয়ে ইকরাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানো হলেও পথেই তাঁর মৃত্যু হয়, যার ফলে এই ঘটনায় একই পরিবারের চার নারীই প্রাণ হারালেন। নিহত শাহিনুর বেগমের আদি বাড়ি কুমিল্লায় হলেও প্রায় ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে তিনি রায়পুরে বসবাস করছিলেন। ২০১৯ সালে তাঁর স্বামী মো. কামাল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার পর তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তিনি ওই বাসায় থাকতেন। ঘটনার সময় শাহিনুরের একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন তাঁর কর্মস্থলে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান, যিনি রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় বাসিন্দারা ঘাতক যুবক অন্তর মজুমদারকে (২৫) আটকে রেখে তীব্র গণপিটুনি দেয়। গুরুতর জখম অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। নিহত অন্তর নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার কার্তিক মজুমদারের ছেলে এবং রায়পুরে একজন ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি প্রায় দেড় বছর আগে স্ত্রীকে নিয়ে ওই এলাকায় ভাড়া থাকতেন এবং সাত-আট মাস আগে বাসা ছেড়ে চলে যান। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি পূর্বপরিচয়ের সূত্রে ওই বাসায় যান এবং এক প্রতিবেশী তাঁর উপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে তিনি পানির পাইপ মেরামতের কথা বলেন। সন্দেহ হওয়ায় ওই প্রতিবেশী বাসার কলাপসিবল গেটটি বাইরে থেকে আটকে স্থানীয়দের খবর দিলে এই নৃশংস ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। ঘটনার পর উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের অন্তত ছয় থেকে সাতজন সদস্য আহত হয়েছেন।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম বলেন, “হাসপাতালে মোট পাঁচজনকে আহত অবস্থায় আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মা ও দুই মেয়ে হাসপাতালে মারা যান। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে আরেক মেয়ের মৃত্যু হয়। গণপিটুনিতে আহত অন্তরও পরে মারা যান।”
লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান, “অন্তর প্রায় দেড় বছর আগে স্ত্রীকে নিয়ে ওই এলাকায় ভাড়া থাকতেন। সাত-আট মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান। পূর্বপরিচয়ের সূত্রে তিনি বৃহস্পতিবার সকালে ওই বাসায় যান বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক প্রতিবেশী তাকে বাসায় দেখে কারণ জানতে চাইলে তিনি পানির পাইপ মেরামতের কথা বলেন। সন্দেহ হওয়ায় ওই প্রতিবেশী কলাপসিবল গেট আটকে স্থানীয়দের খবর দেন। পরে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।”
লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, “পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশ ঘটনাটির তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে উত্তেজিতরা ইটপাটকেল ছুড়লে আমাদের ৬-৭ জন সদস্য আহত হন।”



