দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ মুদি দোকান, কসমেটিকসের দোকান, বিউটি পার্লার ও রেস্তোরাঁর মতো ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব এবং জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যের পর বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা। তবে ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই উদ্যোগের বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন।
মুদি দোকানকে করের আওতায় আনা কি আদৌ সম্ভব?
তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবতার নিরিখে এটি অত্যন্ত কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং একটি প্রক্রিয়া। মুদি দোকানগুলোকে করের জালে আনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো হলো:
-
তথ্যভাণ্ডার ও নিবন্ধনের অভাব: দেশের হাজার হাজার গ্রাম, উপজেলা এবং পাড়া-মহল্লায় থাকা অধিকাংশ ক্ষুদ্র দোকানের কোনো ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (TIN) কিংবা ব্যাংক হিসাব নেই। এনবিআরের কাছে এদের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা ডাটাবেজ নেই।
-
অনানুষ্ঠানিক হিসাবরক্ষণ: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা খাতা-কলমে বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে কোনো আনুষ্ঠানিক আয়-ব্যয়ের নথি সংরক্ষণ করেন না। ফলে তাদের প্রকৃত বিক্রি বা লভ্যাংশ নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব।
-
প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও হয়রানির আশঙ্কা: লাখ লাখ ক্ষুদ্র দোকান শনাক্ত করে তাদের কাছ থেকে কর আদায় করার মতো পর্যাপ্ত জনবল বা প্রশাসনিক সক্ষমতা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নেই। এছাড়া মাঠপর্যায়ে কর কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত তদারকির কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন।
-
বাস্তবায়ন কৌশল: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কর আরোপের ঘোষণা দিয়ে এদের করের আওতায় আনা যাবে না। এর জন্য প্রথমে দেশব্যাপী নিখুঁত ‘বিজনেস ম্যাপিং’, বাধ্যতামূলক সহজ নিবন্ধন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
করের রূপরেখা কেমন হতে পারে এবং কত টাকা আসবে?
করের সম্ভাব্য রূপরেখা: প্রকৃত বিক্রির হিসাবের ওপর কর নির্ধারণ না করে ব্যবসার ধরন, দোকানের আকার, অবস্থান এবং বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের কর বা প্যাকেজ ভ্যাট ধার্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেমন—ঢাকার গুলশান বা চট্টগ্রাম শহরের একটি মুদি দোকানের করের হার এবং মফস্বল বা উপজেলা পর্যায়ের একটি দোকানের করের হার ভিন্ন হবে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বছরে এক হাজার, পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকার মতো একটি ফিক্সড বা সুনির্দিষ্ট কর নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।
কত টাকা রাজস্ব আসতে পারে? মুদি দোকানসহ ক্ষুদ্র খাত থেকে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা রাজস্ব আসবে, সে বিষয়ে এনবিআরের কাছে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে সামগ্রিক ভ্যাট ও কর ব্যবস্থার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে প্রাপ্ত চিত্রটি নিম্নরূপ:
-
দেশে বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধিত হলেও শুধু বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবেই খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ।
-
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে মোট আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই (প্রায় ৯৮ শতাংশ) আসে মাত্র ৫ হাজার বড় প্রতিষ্ঠান থেকে। এর মধ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (LTU)-এর আওতায় থাকা ১০৯টি প্রতিষ্ঠানই দেয় ৬০ শতাংশ ভ্যাট।
-
যদি ৭০ লাখ ক্ষুদ্র বিক্রেতার একটি বড় অংশকে (ধরি ৫০ লাখ) করের আওতায় এনে গড়ে বার্ষিক ২,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা নির্দিষ্ট কর বা ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হয়, তবে তাত্ত্বিকভাবে এই খাত থেকে আনুমানিক ১,০০০ কোটি থেকে ২,৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে।
লাভ-ক্ষতির সমীকরণ: বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, এই ক্ষুদ্র অংকের কর আদায়ের পেছনে সরকারের যে বিপুল পরিমাণ প্রশাসনিক ব্যয় (জরিপ, নজরদারি ও জনবল খরচ) হবে, তা অনেক ক্ষেত্রে সংগৃহীত রাজস্বের চেয়েও বেশি হতে পারে। এছাড়া এই করের বোঝা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর চাপানো হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেবে। তাই ক্ষুদ্র দোকানিদের পেছনে না ছুটে বড় করদাতাদের ভ্যাট ফাঁকি রোধ এবং উৎপাদন ও আমদানিকারক পর্যায়ে ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা বেশি কার্যকর হতে পারে।



