জাতীয় সংসদের স্পিকারকে ‘হাফিজ সাহেব’ বলে সম্বোধন করায় তীব্র তোপের মুখে পড়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। পরবর্তীতে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এই নামকরণের বিষয়ে কঠোর আপত্তি তুললে আন্দালিব রহমান পার্থ তাৎক্ষণিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখপ্রকাশ করেন।
আজ শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশনের ১৬তম কার্যদিবসে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
সংসদে নিজের বক্তব্যের একপর্যায়ে ভোলা জেলার প্রসঙ্গ টেনে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘হাফিজ সাহেব (স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ) থাকলে উনি বিষয়টি রিলেট করতে পারতেন, কারণ উনি ভোলার মানুষ।’ সংসদ সদস্যের মুখে স্পিকারের নাম ধরে এমন সম্বোধন শুনে তাৎক্ষণিক আপত্তি তোলেন সভাপতি ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি পার্থের কাছে জানতে চান, ‘হাফিজ সাহেব কে?’ ডেপুটি স্পিকারের এই প্রশ্নের পর নিজের ভুল বুঝতে পেরে পার্থ চটজলদি বলেন, ‘সরি সরি, স্পিকার সাহেব, আই অ্যাম সো সরি।’
দুঃখপ্রকাশের পর নিজের নির্বাচনি এলাকা ভোলার উন্নয়ন নিয়ে জোরালো দাবি উপস্থাপন করেন আন্দালিব রহমান পার্থ। একটি সুন্দর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘একটি পরিবারে তিন সন্তানের মধ্যে কেউ অঙ্কে ভালো হলে বাবা-মা তার জন্য আলাদা টিচার রাখেন। ভোলায় ১.৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস আছে। আমাদের অঙ্কের টিচারের মতো আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। মন্ত্রীদের আমার পিছে ঘোরা উচিত, অথচ আমি হাসপাতাল, এয়ারপোর্ট ও ব্রিজের জন্য ঘুরছি।’
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রশংসা করে বিজেপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই বাজেটে ৪১ লাখ ফ্যামিলি কার্ড, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের সরঞ্জামের ওপর কর কমানো, স্টার্টআপ সাপোর্ট এবং ক্যানসার-হার্ট-চোখের চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের দাম কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই বাজেটে আমি একটি মেসেজ দেখেছি— একটি স্বৈরাচার আর একটি জনগণের সরকারের মধ্যে মূল পার্থক্যটা কোথায়।’ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ট্র্যাক রেকর্ড গত ১৭ বছর ভালো ছিল না, কারণ তখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। দরবেশ-লুটেরারা কীভাবে দেশ লুট করবে, তার সুব্যবস্থা করা হয়েছিল। জনগণকে শুধু ২০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু দেখানো হয়েছে, যা যথেচ্ছা টাকা খরচ করে বানিয়ে একটি ‘সিম্বল অব অ্যারোগেন্স’ (অহংকারের প্রতীক) হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। শাহজাহানের তাজমহল যেমন অহংকারের প্রতীক ছিল, এটিও তা-ই। অথচ তখন মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছিল।’
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর দেশবাসীকে আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে পার্থ বলেন, ‘আপনারা গত চার মাসের পত্রিকা খুলে একটিও ব্যাংক লুটের খবর দেখাতে পারবেন না। বর্তমানে পলিটিক্যালি প্যাট্রোনাইজড (রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়) কোনো দুর্নীতি নেই। তাই আমাদের বেনিফিট অব দ্য ডাউট দিন। বাজেট নিয়ে সস্তা রাজনীতি না করে এটিকে জাতীয় ইস্যু হিসেবে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’
বক্তব্যের শেষাংশে মদিনা সনদের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার উদাহরণ টেনে দেশে যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি প্রসারের এক অভিনব প্রস্তাব দেন পার্থ। তিনি বলেন, ‘যাকাত আমাদের অর্থনীতির বড় একটি অংশ, কিন্তু এটি হিডেন (লুকায়িত) রয়েছে। আমার প্রস্তাব হলো, প্রত্যেকটি নির্বাচনি আসনে যাকাত পাওয়ার যোগ্য মানুষদের নিয়ে একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হোক। এতে প্রবাসীরাও সহজে যাকাত দিতে পারবেন। এ ছাড়া যাকাত দাতা ও গ্রহীতাদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে একটি ‘যাকাত টেলিভিশন’ চালু করা যেতে পারে।’ একই সঙ্গে ইসলামিক ব্যাংকিং প্রসারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসলামিক ব্যাংকিং এখন সারাবিশ্বে ট্রেন্ড। ইংল্যান্ড, মালয়েশিয়া সব জায়গায় এটি জনপ্রিয়। অতীতে একটি ইসলামী ব্যাংকে ডাকাতি হয়েছে বলে পুরো সিস্টেম খারাপ হয়ে যায়নি, ডাকাত খারাপ ছিল। আমরা উন্নয়নের পাশাপাশি শান্তি চাই, ডিভাইন ব্লেসিং (আল্লাহর রহমত) চাই। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শুধু অন্ধ উন্নয়ন চাই না, যেখানে আত্মহত্যার হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।’



