সাতক্ষীরায় ১৪৬ মিলিমিটার রেকর্ড পরিমাণ টানা বর্ষণে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে পৌরসভাসহ বিভিন্ন উপজেলার ঘরবাড়ি, সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে এবং লাখো মানুষের স্বাভাবিক জনজীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে সাতক্ষীরা জেলায় আকস্মিক ও তীব্র আকারে টানা বর্ষণ শুরু হয়। সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক রাতেই জেলায় ১৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অতিবর্ষণ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আবহাওয়া পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। ফলে জেলার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার তীব্র আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বৈরী আবহাওয়া ও তীব্র জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ এবং সাধারণ কৃষকেরা।
টানা বৃষ্টির কারণে সাতক্ষীরা পৌর সদরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ বিভিন্ন এলাকা এখন পানিতে থইথই করছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, কলেজ মাঠ, হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরের আঙিনায় পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোড থেকে শুরু করে মাঝখোলা এলাকার বাসিন্দারা। এসব এলাকার রাস্তাঘাটে এখন হাঁটু সমান পানি জমে রয়েছে। ফলে বহু মানুষের ঘরবাড়ি, শোবার ঘর, রান্নাঘর ও টয়লেট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সামগ্রিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
ভুক্তভোগী স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার চরম অভাব এবং শহরের বিদ্যমান ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে এই স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং পানি নিষ্কাশনের মূল পথগুলো দখল ও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোডের বাসিন্দা সবুর গাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে সাতক্ষীরার মানুষ একই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো কাজই ঠিকমতো করে না। আমরা ২০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি; আগে যেমন সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যেত, এখনও তাই হচ্ছে। তাহলে উন্নয়নটা হলো কোথায়? এখন সবাই বলছে নতুন সরকার এসেছে, কাজ হবে। আল্লাহ জানেন আদৌ কোনো সুরাহা হবে কি না।’
জলাবদ্ধতার কারণে গৃহস্থালি ও সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। মাঝখোলা গ্রামের গৃহবধূ শাহানারা বেগম নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে বর্ষায় আমাদের এই দশা হয়, কিন্তু কোনো সমাধান মেলে না। রান্নাঘরে পানি ঢুকে হাঁড়ি-পাতিল ভেসে গেছে, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। ঘরে সাপ-পোকামাকড় ঢুকে পড়ার ভয়ে ঘুমাতে পারছি না। সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়েছে।’ সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ তার প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের কথা জানিয়ে বলে, ‘চারদিকে পানি জমে থাকায় কলেজে যেতে পারছি না। নোংরা পানি পার হতে গিয়ে পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। এই সময়ে আমাদের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় খাবার পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে।’
এদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সম্পূর্ণ কাজ হারিয়ে পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দিনমজুর ও ভ্যানচালকের মতো খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ। স্থানীয় ভ্যানচালক ভোলা নিজের চরম আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বৃষ্টির জন্য ভ্যান নিয়ে বের হতে পারছি না, কোনো ভাড়াও নেই। প্রতিদিনের চাল-ডাল কেনাই বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে এনজিওর কিস্তি কীভাবে দেবো, সেই চিন্তায় বুক ফেটে যাচ্ছে।’ একই দুর্দশার কথা জানিয়ে দিনমজুর আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘দুই দিন ধরে ঘরে বসে আছি। কোনো কাজ নেই। পরিবার নিয়ে খুব বিপদে পড়ে গেছি।’
সার্বিক এই নাগরিক সংকট নিরসনে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্নব দত্ত সরকারি পরিকল্পনা ও আশ্বাস ব্যক্ত করে বলেন, ‘নতুন সরকারের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন খাল ও নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে। আশা করছি এবার শহরের জলাবদ্ধতা দূর হবে। পাশাপাশি শহরের স্লুইস গেটগুলো খুলে দেওয়া হবে এবং পানি নিষ্কাশন সচল করতে সব ড্রেন পরিষ্কার করে প্রাণসায়ের খালের সাথে যুক্ত করা হবে। দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আমরা আশা রাখছি।’



