কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় বন্যাকবলিত বসতবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে ঝোড়ো বাতাসে নৌকা উল্টে কৃষক আবদুল মালেকের দুই কন্যাসন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল গত পাঁচ দিনের ভারী ও অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং জলাবদ্ধতার কারণে প্লাবিত হয়েছে। বন্যাকবলিত এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নৌকাই এখন স্থানীয় অনেকের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই নৌযাত্রাগুলো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কৃষক আবদুল মালেকের বাড়ির চারপাশও কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। বসতবাড়িতে পানি বাড়তে থাকায় স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে একটি নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিয়ে একটি ছোট ডিঙি নৌকায় করে আবদুল মালেক তার পুরো পরিবারসহ রওনা হন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় তীব্র ঝোড়ো বাতাসের কবলে পড়ে তাদের ডিঙি নৌকাটি উল্টে যায়। নৌকাডুবির পর পরিবারের সদস্যরা প্রাণপণ চেষ্টা করে সাঁতার কেটে তীরে উঠতে পারলেও প্রবল স্রোতের পানিতে ভেসে যায় তার ১৩ বছর বয়সী বড় মেয়ে হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা। অন্যদিকে তার স্ত্রী লাকি আক্তার, ৯ বছর বয়সী মেঝ মেয়ে জেরিন মনি এবং ৭ বছর বয়সী ছোট মেয়ে শাওরিন মনি কোনোমতে সাঁতার কেটে তীরে উঠতে সক্ষম হন।
ঘটনার পরপরই খবর পেয়ে চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিখোঁজ কিশোরীকে উদ্ধারে অভিযান শুরু করেন। পরবর্তীতে উদ্ধারকাজে গতি আনতে চট্টগ্রাম থেকে একটি বিশেষ ডুবুরি দল আনা হয় এবং পানির নিচে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। টানা চার ঘণ্টার উদ্বেগ, কান্না আর অপেক্ষার পর দুপুর দেড়টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল পানির নিচ থেকে নিখোঁজ ঝর্ণার নিথর মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। চকরিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা দিদারুল হক এই দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে নৌকাডুবির ঘটনায় আহত ও সংকটাপন্ন অবস্থায় দুই বোন জেরিন মনি ও শাওরিন মনিকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরেই ৭ বছর বয়সী ছোট বোন শাওরিন মনিরও মৃত্যু হয়। বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কাইছার উদ্দিন এই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির কথা উল্লেখ করে গভীর শোক প্রকাশ করেন। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে একই পরিবারের দুই বোনের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় এখন গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং স্বজনদের আহাজারিতে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।



