ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ভারতের নয়া দিল্লিতে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘রয়টার্স’-কে একটি খোলামেলা ও দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা, দলীয় সহকর্মীনিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ, প্রত্যাবর্তন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ নিজের ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ শুক্রবার (১০ জুলাই)
‘অল ক্রাইম.টিভি-র পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশের হাসিনা দলীয় সহকর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন
সারসংক্ষেপ
ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশী নেতা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দেশে ফিরলে তাঁর প্রাণনাশের ঝুঁকি রয়েছে।
হাসিনা বলেন, স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার পর তিনি ও তাঁর দলীয় সহকর্মীরা আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সত্ত্বেও পরিকল্পিত প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ঢাকার সাথে কোনো যোগাযোগ হয়নি বলে জানান হাসিনা।
আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন হাসিনা।
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড এবং দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে তিনি এবং তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ সহকর্মীরা ভারতের নির্বাসন থেকে আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী নেতা জানান, তিনি এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের সদস্যরা দুই বছর আগে পালিয়ে আসা দেশে স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তারা আদালতে হাজির হয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি দেশটির আচরণ কেমন হয় তা পরীক্ষা করতে চান।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চলা প্রায় এক ঘণ্টার একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা বলেন, “আমার ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “তবুও আমাকে যেতেই হবে। আমার দলের নেতা ও কর্মীরা চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যু আসে, তবে আমি চাই তা যেন আমার নিজের মাটিতেই আসে, যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।”
নির্বাসনের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন
টানা ২০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান। একটি ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণঘাতী দমনপীড়নের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে দেশটির যুদ্ধাপরাধ আদালত গত নভেম্বরে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তবে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পোশাক রপ্তানিকারক এই দেশটির দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর যখন ঢাকার সরকার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, ঠিক তখন হাসিনার এই প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও উসকে দিতে পারে। অন্যদিকে, এটি ভারতের সাথে সম্পর্কে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে, যা নয়া দিল্লি তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার পর বেশ অবনতির দিকে গিয়েছিল।
বাংলাদেশ বারবার ভারতের কাছে তাঁর হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছে।
নির্বাসনে যাওয়ার পর এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে লিখিত জবাব দিলেও এবারই প্রথম কোনো সাক্ষাৎকার দিলেন হাসিনা। তিনি জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সাথে পরামর্শ করেননি।
এবারই প্রথম তিনি দেশে ফেরার জন্য একটি সময়সূচী নির্ধারণ করলেন এবং নিজে ও নির্বাসিত অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানালেন। তাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। তবে রয়টার্স অন্য দলীয় সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করতে বা তারা কোথায় আছেন তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
হাসিনা বলেন, ঢাকার কর্তৃপক্ষ “আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতে চিঠি পাঠাচ্ছে। আমি নিজেই চলে যাব।”
হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারি মুখপাত্ররা মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেননি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে গত এপ্রিলে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছিল যে তারা হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ পরীক্ষা করে দেখছে এবং তারা “নতুন সরকারের সাথে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে” চায়।
একসময়ের গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ
সামরিক অভ্যুত্থানে বাবা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর স্পটলাইটে আসা হাসিনা অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন এবং ১৭ কোটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব পেয়েছিলেন। তবে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে ভিন্নমত দমন এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য ধ্বংস করার অভিযোগ ওঠে, যা তিনি বরাবরই অস্বীকার করেছেন।
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর পতনের কারণ হওয়া ঐ দমনপীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল।
দিল্লি থেকে হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের অনেকেই আত্মগোপনে আছেন। তাই আমি বলেছি যে এবার আমি দেশে ফিরছি, এবং একদিন আপনাদের সবাইকে আসতে হবে। আমরা সবাই একসাথে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”
তবে তিনি দেশে ফেরার বা আত্মসমর্পণের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, “আমি বিচারে বিশ্বাস করি এবং আমার মনে হয় যখন আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে, তখন জনগণের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক—এবং আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।”
‘জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন,’ বললেন হাসিনা
গণমাধ্যম এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সরকারের পতনের পর থেকে অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী গ্রেপ্তার, আইনি মামলা এবং শারীরিক হামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
হাসিনা জানান, দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার সাথে তাঁর কোনো যোগাযোগ হয়নি। “গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং বিচার কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।”
জেলে যাওয়ার বিষয়ে কোনো চিন্তা করছেন না জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে আগেও তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালে বাবার হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় তিনি বারবার আটক হন। এরপর ২০০৭ সালে একটি সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে আবার জেলে পাঠানো হয়। পরে তিনি মুক্তি পান এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
এবার দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, আন্দোলনকারী জনতা যখন তাঁর বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন তাঁর জীবনের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, “একটি সরকার যখন দীর্ঘ সময় কাজ করে, তখন কিছু ভুল হতেই পারে—কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।”
হাসিনা জানান, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের সাথে অনলাইন বৈঠক করেছেন।
তিনি বলেন, “তারা হয়তো আমাকে সাজা দিয়েছে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব না। কিন্তু তারা কেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করবে? আমরা যদি খারাপ করে থাকি, তবে জনগণকেই সেই সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হোক।”



