পরীক্ষামূলক সংস্করণ

চট্টগ্রামে বন্যা-পাহাড়ধসে মৃত ৩৯, বিপর্যস্ত ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের জেরে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৫ জেলায় প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কক্সবাজার জেলায় ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩ জনই রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে ৮ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙ্গামাটিতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং ভারতের উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও সংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই ৫টি জেলাকেই পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৬টি উপজেলাসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যার কবলে পড়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে ২৩ হাজার ৮৫৩ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যা দুর্গতদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়, যেখানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার স্রোতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সাতকানিয়ার বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বহু এলাকায় টানা ৩ দিন ধরে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কোমর থেকে বুক সমান পানি থাকায় রান্নাঘর ডুবে গেছে এবং বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বন্যা কবলিত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিকভাবে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের কারণে রাঙামাটির সাজেক উপত্যকায় আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উদ্ধার করে নিরাপদ গন্তব্যে পাঠিয়েছে এবং নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ১৫ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

চট্টগ্রামের বাইরে হবিগঞ্জ জেলায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সদর, বাহুবল ও বানিয়াচং উপজেলার লস্করপুর, পইল, লামাতাশি ও মক্রমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের কয়েকটি অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে বাগেরহাটের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোরশেদুর রহমান বলেন, ‘ইউনিয়নের অন্তত পাঁচটি ওয়ার্ড পুরোপুরি পানির নিচে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন এক টন চাল বরাদ্দ দিলেও পানির কারণে তা এখনও আনাসম্ভব হয়নি।’

ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘চার লাখের বেশি মানুষ এখনও পানিবন্দি। উপজেলার প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় সেখানে পৌঁছানোই সবচেয়ে বড়挑戰। সেনাবাহিনী স্পিডবোট ব্যবহার করে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘উপজেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনও পানির নিচে। এক লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত ৪৬ টন চাল, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ৬ হাজার মানুষের জন্য রান্না করা খাবার বিতরণ করা হলেও কয়েকটি এলাকায় এখনও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।’

সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জাতীয় সংসদে জানান, ‘সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।’ (উল্লেখ্য, পরবর্তীতে মাঠ পর্যায়ের প্রাপ্ত তথ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে পৌঁছায়)।

সম্পর্কিত বিষয়:

প্রধান খবর

গুলিতে নিহত যুবদল কর্মী/ কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশাতেই হত্যার নীল নকশার অভিযোগ

গত শুক্রবার ২৪ জুলাই রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় গুলি করে যুবদলের কর্মী ইউসুফকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার পরবর্তী এক সংবাদ সন্মেলনে পুলিশের পক্ষ থেকে এলাকা আধিপত্য ও

চট্টগ্রাম নগরের আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার

মুনতাসীর মামুন : চট্টগ্রাম নগরের আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বুধবার (২৯ জুলাই) যশোরের ঝিকরগাছা সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইমনের গ্রেপ্তারের বিষয়টি

কমলাপুর রেলস্টেশনে নিয়মিত যৌথ অভিযান চালাবে র‍্যাব ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ

মুনতাসীর মামুন : টিকিট কালোবাজারি, মাদক ও চোরাচালান বন্ধে টাউনহল সভায় সিদ্ধান্ত রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন ও আশপাশের এলাকায় টিকিট কালোবাজারি, মাদক ও চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে নিয়মিত যৌথ অভিযান চালাবে

আসছে...