২৫ বছর আগে বাড়ি থেকে রাগ করে নিখোঁজ হওয়া বগুড়ার বাকপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধা ওয়াহিদা বেগম নরসিংদীর রায়পুরায় রেলস্টেশনে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হওয়ার পর ফেসবুকের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করে কবরের সন্ধান পেয়েছেন স্বজনেরা।
গত ৪ জুলাই রাত ২টার দিকে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা রেলস্টেশনের একটি পরিত্যক্ত কক্ষে ঘুমন্ত অবস্থায় সত্তর বছর বয়সী বাকপ্রতিবন্ধী এক বৃদ্ধাকে মারধর করে তার দুই যুগের জমানো টাকা লুট করে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলায় তার চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত করা হয়। পরবর্তীতে ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় এবং রাত সোয়া ১টার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে কোনো স্বজন না থাকায় স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্টেশন সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মেথিকান্দা স্টেশনমাস্টারের দায়ের করা মামলায় ইতিমধ্যে পাঁচ জন আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
নিহত এই নারীর প্রকৃত নাম ওয়াহিদা বেগম, যার বয়স ৭০ বছর। তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। তবে মেথিকান্দা স্টেশন এলাকায় দুই যুগ ধরে তিনি ‘ববি বেগম’ নামে পরিচিত ছিলেন। রেলস্টেশনের লোকজন ও রেলওয়ে পুলিশ জানায়, প্রায় ২৫ বছর আগে এক দুপুরে মেথিকান্দা স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন ওয়াহিদা। এরপর বাকশক্তি না থাকায় নিজের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে না পেরে স্টেশন সংলগ্ন পরিত্যক্ত কক্ষকেই নিজের আশ্রয় বানিয়ে নেন। সেখানে তিনি বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারের কাজ করতেন। স্থানীয়দের দেওয়া খাবার এবং ৫-১০ টাকা জমিয়ে তিনি যে অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন, তা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই দুর্বৃত্তরা তার ওপর এই নৃশংস হামলা চালায়।
পারিবারিক ইতিহাস ও নিখোঁজ হওয়ার পটভূমি সম্পর্কে ওয়াহিদার প্রতিবেশীরা জানান, অত্যন্ত দরিদ্র এই পরিবারটির বাবা-মা এবং আট সন্তানের মধ্যে সাত জনই বাকপ্রতিবন্ধী। ওয়াহিদাসহ তিন ভাইবোনের ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে এবং জীবিত পাঁচ জনের সবাই বাকপ্রতিবন্ধী। বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় ওয়াহিদার স্বামী মারা যান এবং তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া একমাত্র কন্যাসন্তানটিও জন্মের পরপরই মারা যায়। এরপর একা হয়ে পড়া ওয়াহিদা বাবার বাড়িতেই থাকতেন। ২৫ বছর আগে ছোট বোনের সঙ্গে তীব্র ঝগড়া করে রাগ করে তিনি ট্রেনে উঠে বাড়ি থেকে চলে যান। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে ধরে নিয়েছিলেন যে ওয়াহিদা মারা গেছেন।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর ফেসবুকে ছবি ও মেথিকান্দা রেলস্টেশনে মারধরে বৃদ্ধা নিহতের ভিডিও চিত্র দেখে তার পরিচয় শনাক্ত করেন স্বজনেরা। ওয়াহিদার ভাগ্নি জামাই সৈকত ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকে চোখ বোলানোর সময় রেলস্টেশনে বৃদ্ধা নিহতের ঘটনাটি তার সামনে আসে। পাশে থাকা তার স্ত্রী ছবিটি দেখে নিহত নারীকে তার খালা ওয়াহিদার মতো বলে সন্দেহ করেন। পরদিন বগুড়ার বাড়িতে সব আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ছবিটি পাঠানো হলে তারাও নিশ্চিত করেন যে ববি বেগম আসলে নিখোঁজ ওয়াহিদা।
শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে ওয়াহিদার ভাগনে গোলাম রব্বানী ও ভাগ্নি জামাই সৈকত ইসলাম একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে মেথিকান্দা স্টেশনে আসেন, যা দেখে স্থানীয় বয়স্ক ব্যক্তিরা নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করেন। এরপর তারা মেথিকান্দা স্টেশন সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে ওয়াহিদা বেগমের কবর জিয়ারত করেন। ভাগনে গোলাম রব্বানী আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমার মায়ের সঙ্গেই ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওয়াহিদা খালা। ভিডিও কল করে বাড়ির সবাইকে খালার কবর দেখিয়েছি। শেষ পর্যন্ত ২৫ বছর পর খালার খোঁজ পেলাম, তাও মৃত্যুর পর। রবিবার তার ভাইবোনসহ আরও আত্মীয়স্বজন কবর জিয়ারত করতে যাবেন।”
বগুড়ার গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হোসেন এবং ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাঈদ আহমেদ নিহত নারীর পরিচয় ও স্বজনদের মেথিকান্দা আসার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মো. সাঈদ আহমেদ বলেন, “রেলস্টেশনে নিহত নারীর নাম ওয়াহিদা বেগম। তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুজন শনিবার এসে কবর জিয়ারত করেছেন, অন্য সদস্যদের রবিবার আসার কথা আছে।”



