জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণার পর রংপুর ও যশোরের পেট্রোলপাম্পগুলোতে যানবাহনের উপচে পড়া ভিড়, দীর্ঘ সারি ও গ্রাহকদের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পেতে দেখা গেছে।
রোববার তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আসার পরপরই নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগেই আগের দামে তেল সংগ্রহ করতে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে পাম্পগুলোতে ছোটেন চালকেরা। রাত পৌনে ১২টার দিকে রংপুর নগরের মেসার্স সুরমা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় অসংখ্য মোটরসাইকেল আরোহী তেল নিতে অপেক্ষা করছেন। সেখানে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এই অস্বাভাবিক ভিড় সামলাতে পাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের চরম হিমশিম খেতে হয় এবং তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে অনেকে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তেল নিতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করে মোটরসাইকেল আরোহী আবু হানিফ বলেন, “কোনো কথা নাই, আলোচনা নাই, হঠাৎ লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় দিছে সরকার। এটা কেমন সরকার?” একই স্থানে উপস্থিত সিরাতুন নবী নামের আরেক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দুই-চার টাকা বাড়াইলেও হইতো। তাই বলে লিটারে ২০ টাকা!” তেলের আকাশছোঁয়া দাম বৃদ্ধি ও মানুষের নীরবতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ইমতিয়াজ হোসেন নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী বলেন, “এত বেশি দাম বাড়াইলো, কারও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখছি না। এভাবে কি চলে? মানুষের সবকিছু সয়ে গেল নাকি!”
রংপুরের মেসার্স আকবর অ্যান্ড সন্স পেট্রলপাম্পেও গভীর রাত পর্যন্ত একই রকম ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা যায়। ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টার দিকে এগোতে থাকলে তেল না পাওয়ার আশঙ্কায় লাইনে অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। এরপর ঠিক রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পাম্পের মিটারে প্রতি লিটার তেলের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হলে আগে থেকে লাইনে অপেক্ষায় থাকা বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেল আরোহী চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন।
পাম্পে আগের থেকে মজুদ থাকা তেল বর্ধিত দামে বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন তুলে নুরুল ইসলাম নামের একজন বলেন, “এক ঘণ্টা ধরে আগের দামে তেল পেতে এখানে আছি। আমি কেন আগের রেটে তেল পাব না? পাম্পের তেল তো শেষ হয়নি। তাহলে আগের তেল বেশি দামে বিক্রি করবে কেন?” বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে মোটরসাইকেল চালক নজমুল ইসলাম বলেন, “সরকার বলল, ১২টা থেকে বেশি দাম কার্যকর। প্রশ্ন হচ্ছে, পাম্পে থাকা আগের তেল শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেশি দামে বেচবে কেন? সরকার কি পাম্পমালিকদের আগের তেল বেশি দামে বিক্রির সুযোগ দিল? সাধারণ জনগণের দিকে সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।”
হঠাৎ পাম্পে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড় জমা নিয়ে মেসার্স আকবর অ্যান্ড সন্স পেট্রলপাম্পের দায়িত্বে থাকা শওকত হোসেন নিজের মন্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় হঠাৎ পেট্রলপাম্পে ভিড় বেড়ে যায়। এটা অস্বাভাবিক নয়। লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো কম কথা নয়।” তবে রাত ১২টা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে পাম্পগুলো অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়।
একই চিত্রে দেখা গেছে যশোরেও, যেখানে দাম বাড়ার ঘোষণার পরপরই পেট্রলপাম্পগুলোতে চালকদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। রাত ১১টার দিকে যশোরের এম কে রোড এলাকার মেসার্স তোফাজ্জল হোসাইন পেট্রলপাম্পে গিয়ে দেখা যায় জ্বালানি তেল নিতে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন লেগেছে। সড়কের এক পাশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যানবাহন সামলাতে নিয়োজিত কর্মীদের বেশ বেগ পেতে হয়।
পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়ার সময় পরিবারের বাড়তি খরচের চাপ নিয়ে উদ্বেগ জানান বেসরকারি চাকরিজীবী জাহিদুল ইসলাম শেখ। তিনি বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি হলেও আমাদের আয় বাড়েনি। এমন অবস্থায় একলাফে লিটারে ২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। বর্তমান সময়ে আমাদের মতো বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সংসার চালানো এমনিতেই কঠিন, তার ওপর এই বাড়তি খরচ সামলানো খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে।” পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তোফাজ্জল হোসাইন পেট্রলপাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, তেলের দাম বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাতজুড়ে অস্বাভাবিক ভিড় শুরু হয়েছিল, যা সামাল দিয়ে তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে পাম্পের কর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে গেছেন।



