চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বর্তমানে কর্মরত ও বিভিন্ন ইউনিটে বদলি হওয়া প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। বিভিন্ন মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত এসব পুলিশ সদস্য নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হওয়ায় একের পর এক সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র ও সিএমপির দাপ্তরিক চিঠিতে জানা গেছে।
সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ‘অতীব জরুরি’ চিঠি পাঠাচ্ছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। গত ৩ অক্টোবর সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ১৮টি পৃথক স্মারকে এসব চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত তারিখে সকাল ৯টার মধ্যে আদালতে হাজিরা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
সিএমপির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের বিরুদ্ধে আগে একাধিকবার সমন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং সর্বশেষ অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। এরপরও তারা আদালতে হাজির হননি। তাদের অনুপস্থিতিকে মামলার নিষ্পত্তির ‘প্রধান অন্তরায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীরা হাজির না হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫(ক) ধারায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানানো হয়েছে।
সাক্ষীদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তাদের কেউ বর্তমানে চট্টগ্রামে কর্মরত, আবার কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। কয়েকজন সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও এসবির মতো বিশেষায়িত ইউনিটেও কর্মরত রয়েছেন।
সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে যেসব পুলিশ সদস্যের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বিভিন্ন তারিখ নির্ধারিত হয়েছে, তাদের অধিকাংশই একসময় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও ইপিজেড থানায় দায়ের করা হয়েছে।
এসব মামলার বিচার চলছে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন বিশেষ আদালত ও শিশু আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে। পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি মামলার বিচারকাজেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সিএমপির উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল জানিয়েছেন, মামলার ধার্য তারিখে পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে এলে ভাতা সুবিধা পান। তবে অবসরপ্রাপ্ত বা চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রে আদালতে আসার ভাতা ও যাতায়াত খরচ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সমনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিপি নম্বর না থাকায় তার বর্তমান কর্মস্থল শনাক্ত করতেও সমস্যা হয়।
একাধিক পুলিশ সাক্ষী অবশ্য অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন ইউনিটের রিজার্ভ অফিসের সমন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতির কারণে অনেক সময় আদালতের সমন যথাসময়ে তাদের কাছে পৌঁছায় না। ফলে ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত হতে না পারার পর তাদের বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হচ্ছে বলে তারা দাবি করেছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সিএমপির পক্ষ থেকে সমন শাখার গাফিলতি নিশ্চিত করা হয়নি।
শুধু সাধারণ বা নিম্ন আদালতের মামলায় নয়, গুরুতর অপরাধের মামলার বিচারকাজেও পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়ছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তৃতীয় আদালত ২০২২ সালে দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেন।
এর আগেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিচারাধীন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সাক্ষ্য দিতে আদালতে অনুপস্থিত থাকায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালত তিন শতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। নতুন করে প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির ঘটনায় পুরোনো মামলার পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা এবং বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।



