সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হয়েছে। চুক্তির আওতায় ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো সৌদি আরবে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। তবে এসব সেনা সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে, নাকি সৌদি ভূখণ্ড ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুরক্ষায় থাকবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এরই মধ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযান এবং নতুন এই জোটের ভূমিকা কতদূর বিস্তৃত হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সৌদিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার রিয়াদে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো সৌদি আরবে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান ও তুরস্ক।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আওতায় চুক্তিভুক্ত সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা সরবরাহ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী সৌদি আরবে দ্রুত সেনা মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে।
তবে সেনার সংখ্যা বা তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে বিবৃতিতে কিছু জানানো হয়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পাল্টা অভিযানে ১০০টি যুদ্ধবিমান সহায়তা দিচ্ছে। অভিযানের লক্ষ্য হুতিদের দখলে যাওয়া অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করা।
পাকিস্তানের ভূমিকা কতটা?
বৈঠক শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তানি সেনারাও ইতোমধ্যে এতে ভূমিকা রাখছেন। রিয়াদ থেকে জিও নিউজকে তিনি জানান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সেনারা সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন। তবে সরাসরি লড়াই করছে সৌদি বাহিনী।
এর ফলে সৌদি আরব যখন হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, তখন পাকিস্তানের ভূমিকা আপাতত প্রতিরক্ষামূলক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ইসলামাবাদ আর কতদিন সরাসরি লড়াই থেকে দূরে থাকতে পারবে।
সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৬৭ সাল থেকেই পাকিস্তান সৌদি সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ১৯৮২ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও পাকিস্তান সৌদি আরবে বড় একটি সেনাদল পাঠিয়েছিল। তবে তাদের দায়িত্ব ছিল প্রতিরক্ষা।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে পাকিস্তান। ওই চুক্তিতে বলা হয়, যেকোনো একটি দেশের ওপর আগ্রাসন হলে সেটিকে উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তুরস্কের সেনা মোতায়েন নিয়ে অনিশ্চয়তা
সৌদিতে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। খাজা আসিফ তুরস্কের সেনারাও সেখানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন। তবে আঙ্কারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সেনা মোতায়েনের কথা নিশ্চিত করেনি।
ইস্তাম্বুলের ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোকহান এরেলি আল জাজিরাকে বলেছেন, সৌদি আরবে তুরস্কের স্থায়ী সেনা মোতায়েনের বিষয়ে প্রকাশ্য কোনো স্বীকৃতি নেই। তার মতে, তুরস্কের সংবিধানের ৯২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশে সেনা পাঠানোর ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে। মক্কা চুক্তিটি এখনো তুরস্কের পার্লামেন্ট অনুমোদন করেনি।
সৌদি আরবের লক্ষ্য কী?
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফেরের মতে, সৌদি আরব মক্কা চুক্তিকে শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে রাখতে চায় না; বরং এটিকে প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।
তার মতে, আপাতত সৌদি আরব চায় পাকিস্তান ও তুরস্ক দেশটির ভূখণ্ড রক্ষা এবং আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সহায়তা করুক। এর মাধ্যমে হুতিদের কাছে বার্তা দেওয়া হতে পারে যে সৌদির ওপর হামলা হলে বিষয়টি শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
চলমান সংঘাতে হুতিরা সৌদি আরবের একাধিক শহর ও স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত সোমবার সন্ধ্যায় দেশটির দুটি বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে। এতে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের কমিটি সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এসব হামলা এবং এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
পাকিস্তানের অবস্থান প্রতিরক্ষামূলক
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এর আগে বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির এবং এর কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই।
ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিনের মতে, পাকিস্তানের ভূমিকা বড় আকারের না হয়ে বিশেষায়িত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, ড্রোন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সাইবার বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ার কোর ও বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা এতে ভূমিকা রাখতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।
তুরস্কের ভূমিকাও সীমিত থাকতে পারে বলে মনে করেন গোকহান এরেলি। তার মতে, কূটনৈতিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহের মতো ক্ষেত্রে তুরস্কের ভূমিকা দেখা যেতে পারে।
ইরানের সতর্কতা
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ও সৌদিতে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি ইরানও পর্যবেক্ষণ করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইয়েমেনে যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের খবর সত্য নয় বলেই ইরান আশা করে। নতুন কোনো হস্তক্ষেপ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
তেহরানের পারস্য উপসাগরীয় স্টাডিজ গ্রুপের বিশ্লেষক জাভাদ হেইরান-নিয়ার মতে, সৌদি ভূখণ্ড ও অবকাঠামো রক্ষায় পাকিস্তানি সেনাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকলে তেহরান তা মেনে নিতে পারে। তবে হুতিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযানে পাকিস্তান যোগ দিলে সেটিকে ইরান ভিন্নভাবে দেখতে পারে।
২০১৫ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ইয়েমেন সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে একই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘিত হলে বা পবিত্র স্থানগুলো হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তান সৌদির পাশে থাকবে।
সরাসরি যুদ্ধে যাবে কি পাকিস্তান-তুরস্ক?
সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা এখনো কতটা সামরিক এবং কতটা প্রতিরক্ষামূলক হবে, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তুরস্কও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি ভূখণ্ড ও বাব আল-মান্দেব নিরাপদ রাখার মধ্যে অভিযান সীমিত থাকলে সংঘাতের পরিধি নিয়ন্ত্রিত থাকতে পারে। কিন্তু হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করা বা ইয়েমেনের রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য নেওয়া হলে পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
২০১৪ সাল থেকে সানা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সামরিক প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত সৌদি প্রতিরক্ষা পর্যন্ত সীমিত থাকবে, নাকি পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



