পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলা বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও হরমুজে ট্যাঙ্কার হামলা বৃদ্ধিকে সরবরাহঝুঁকির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ২৭ মিনিটের দিকে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মূল্য ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ২৮ ডলার বা ২ দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়ে ১০২ দশমিক ২৮ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ দশমিক ৬৬ ডলার বা ১ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৮৯ দশমিক ৯৪ ডলারে পৌঁছায়।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির রেকর্ড মূল্য ও সরবরাহে বিঘ্ন ঠেকাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মধ্যে বুধবার তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। মার্চে চালু করা পরিকল্পনার আওতায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগের পরিকল্পনার আওতায় আরও প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে আসার কথা রয়েছে এবং ডিজেল সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে ইরানকে ঘিরে মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত অষ্টম মাসে গড়ানোর মধ্যে অক্টোবরে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনকারী জাহাজের ওপর হামলার ঝুঁকি বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। সাম্প্রতিক হামলার কারণে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলও কমেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্য করে অন্তত ১২টি হামলা, হামলার চেষ্টা বা হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এটি সংঘাত শুরুর পর কোনো এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ সংখ্যা।
গত ৬ অক্টোবর হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে, যা ২৩ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন। একই সময়ে প্রণালিটি দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহন ২৭ শতাংশ কমে দৈনিক ১০ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
সর্বশেষ হামলায় কাতারের উত্তরে একটি ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক একটি হামলায় একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে প্রজেক্টাইল আঘাত হানে এবং এতে নাবিকেরা আহত হন। এসব ঘটনার ফলে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বেড়েছে।
এদিকে এমএসটি মার্কির জ্বালানি বিভাগের প্রধান সল কাভোনিক বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজে ইরানি হামলার হার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং তা আরও বাড়তে পারে। সীমিত পণ্যপ্রবাহ, বেশি পরিবহন ব্যয় এবং ইরানের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা তেলের দামকে ঊর্ধ্বমুখী রাখছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এএনজেডের বিশ্লেষক ড্যানিয়েল হাইন্স এক নোটে বলেন, আইইএ যে তেল ছাড়ছে, তা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর সময় সংস্থাটির নির্ধারিত ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার পরিকল্পনার অংশ। তাঁর মতে, কৌশলগত মজুত থেকে এর বাইরে অতিরিক্ত তেল উত্তোলন করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
তেলের দামে আরও সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত কমে যাওয়ার তথ্য। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) জানিয়েছে, ২ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩২ লাখ ব্যারেল কমে ৪২ কোটি ৪১ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা ১৭ লাখ ব্যারেল কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, একই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুত ৪২ হাজার ব্যারেল কমে ১০ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। ২ অক্টোবরের হিসাবে ডিস্টিলেট মজুত ছিল ১০৫ দশমিক ১৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল, যা এক বছর আগের তুলনায় ১৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ব্যারেল কম।
ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি ঝুঁকি এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক কম জ্বালানি মজুত—দুই কারণই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সরবরাহ উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।



