ড. আব্দুল ওয়াদুদ
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বরাজনীতির অন্যতম অস্থির অঞ্চল। ধর্মীয় বিভাজন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চলে সংঘাত যেন স্থায়ী বাস্তবতা। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ এবং সংঘাতের যে নতুন পর্ব দেখা যাচ্ছে, তা শুধু দুই দেশের নয়; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
ইরান ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব মূলত আদর্শিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল । সে সময় ইরানের রাজতান্ত্রিক সরকার পশ্চিমা শক্তির ঘনিষ্ঠ ছিল। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পালটে যায়। ইরানে আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইসরায়েলকে ‘অবৈধ রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করে। ইরানের দৃষ্টিতে ইসরায়েল একটা দখলদার রাষ্ট্র। সেই থেকে দুই দেশের সম্পর্ক চরম শত্রুতায় রূপ নেয়। ইরান ফিলিস্তিনি আন্দোলন এবং ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমর্থন করতে শুরু করে। অন্যদিকে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাত ক্রমেই তীব থেকে তীব্রতর হয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও এই সংঘাতকে তীব্র করেছে। ইসরায়েল বরাবরই অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছে, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হতে পারে । যদিও ইরান দাবি করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত ।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে দুই দেশের পরোক্ষ সম্পৃক্ততা। সিরিয়া, লেবানন ও গাজা অঞ্চলের ঘটনাবলি প্রায়ই এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় পূর্বে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও হামলা, পালটা হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং সামরিক ঘাঁটিতে আঘাতের মাধ্যমে সংঘাত নতুন মাত্রা পায়।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে বৈরী। ফলে এই সংঘাত আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
রান-ইসরায়েল যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাত কেবল দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক বা রাজনৈতিক বিরোধ নয়; বরং এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মেরুকরণের প্রতিফলন। ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বকে অনেক বিশ্লেষক পূর্বে ‘ছায়াযুদ্ধ’ বা Proxy War হিসেবে বর্ণনা করেন। বহু বছর ধরে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও, বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে এই সংঘাত চলমান ছিল ।
এই যুদ্ধের রাজনৈতিক মেরুকরণ যেমন গভীর, তেমনি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। প্রশ্ন হচ্ছে—এই সংঘাত কি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা, নাকি এটি পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই পরিস্থিতিতে শান্তির পথ কোথায়?
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে দুই শিবিরে বিভক্ত করেছে। একদিকে রয়েছে ইরান ও তার মিত্র শক্তি সিরিয়া, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের কিছু শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতি, অন্যদিকে রয়েছে ইসরায়েল এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকারী আরব রাষ্ট্রসমূহ – বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরব। এই বিভাজনকে পূর্ব থেকেই অনেক বিশ্লেষক ‘মধ্যপ্রাচ্যের ঠান্ডা যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেন । ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান মিত্র। সামরিক, কুটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন করে আসছে। অন্যদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভিন্ন ধরনের অবস্থান নিয়েছে। রাশিয়া সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে চায় । চীন মূলত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে।
এই বহুমাত্রিক শক্তির প্রতিযোগিতা ইরান- ইসরায়েল সংঘাতকে আরো জটিল করে তুলেছে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল। এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লেই তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। কারণ এসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল । তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে তাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে থাকে । সেটাই এখন দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এই ধরনের বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়; বরং এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের দিকে এগোচ্ছে। যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হয় সাধারণ মানুষ । মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে আমরা বারবার দেখেছি যুদ্ধ মানে ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক বিপর্যয় ।
সম্প্রতি যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত যুদ্ধে ইরানে নিহত ১ হাজার ৫৪৪ জন, আহত প্রায় ১৮ হাজার ৫৫১ । অন্যদিকে ইসরায়েলে নিহত অন্তত ১৭ জন বেসামরিক ও দুই জন সৈনা । আহত প্রায় ২ হাজার ১৯৭৫ জনের বেশি। মার্কিন বাহিনীর নিহত প্রায় ১৪ জন সেনা । এছাড়াও বেশ কয়েক জন নিহত ও আহত হয়েছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশেরও আছে অন্তত দুই জন ।
সামরিক ক্ষয়ক্ষতি : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল্যায়ন অনুযায়ী : ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ইরানি সামরিক সদস্য নিহত, ১৯০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস, প্রায় ৯০টি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ডুবে গেছে। প্রায় ৩১ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪ হাজার যানবাহন ধ্বংস। তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের রিফিউজি এজেন্সি ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে ইতিমধ্যে ৩২ লাখ ইরানিকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে। অন্যদিকে ইরান এ পর্যন্ত ১৬ দিনে কমপক্ষে ২ হাজার ড্রোন এবং ৫ শতাধিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে ব্যালিস্টিক মিসাইলও রয়েছে। ইসরায়েলে মিডিয়া ব্ল্যাক আউট হওয়ার কারণে সব খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তবে যতটুকু পাওয়া গেছে— তাতে তেল আবিব, জেরুজালেম ও হাইফাসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যদি ব্যাপকহারে বিভিন্ন দেশের পক্ষে-বিপক্ষে অংশগ্রহণ হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো অঞ্চলে মানবিক সংকট তৈরি হবে । ইতিহাস সাক্ষী যে, যুদ্ধ কখনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। বরং এটি নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়।
যুদ্ধ কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক নয়, এটি মানুষের চিন্তা ও মনস্তত্ত্বকেও প্রভাবিত করে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি বিশ্ব জুড়ে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। কেউ ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে সমর্থন করছে, আবার কেউ ফিলিস্তিন ও ইরানের অবস্থানকে সমর্থন করছে। এই মেরুকরণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরো জটিল করে তুলছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে কঠিন করে দিচ্ছে। এই সংঘাতের সমাধান যুদ্ধের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং কূটনৈতিক আলোচনাই একমাত্র কার্যকর পথ ।
প্রথমত, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে, তার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে একটি সমন্বিত নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে সব দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে ।
তৃতীয়ত, ফিলিস্তিন সমস্যার ন্যায্য সমাধান ছাড়া এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন । জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উচিত সংঘাত নিরসনে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া ।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ নয়; এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংকট। এর রাজনৈতিক মেরুকরণ বিশ্বরাজনীতিকে নতুন করে বিভক্ত করছে এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলছে ।
বিশ্ব যদি সত্যিই শান্তি চায়, তাহলে তাকে যুদ্ধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা শুধু ঐ অঞ্চলের মানুষের জন্য নয়; বরং পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



