পরীক্ষামূলক সংস্করণ

১ কোটি ২৮ লাখ টাকার অডিওতেই ঘনীভূত বিতর্ক, ফেঁসে গেলেন পুলিশ কর্মকর্তা

অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক

ছয় বছর আগে ঢাকায় সংঘটিত একটি চাঞ্চল্যকর অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনার জের ধরে পুলিশের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্ত শেষে গুরুতর শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। আলোচিত ওই কর্মকর্তা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কায়সার রিজভী কোরায়েশী। বিভাগীয় তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ঘটনায় তাঁর নেতৃত্বাধীন দলের আরও পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন মাত্রার শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি শুরু হয় ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর। ওই দিন দুবাইপ্রবাসী রোমান মিয়া ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পথে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফুফাতো ভাই মনির হোসেন। কাওলা এলাকায় পৌঁছালে একটি সংঘবদ্ধ দল তাদের পথরোধ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে আসা ওই দল নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দেয়। এরপর রোমান মিয়াকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মনির হোসেনকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়।

অপহরণের পর রোমান মিয়াকে নির্যাতন করে তার কাছ থেকে নগদ অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠে। পরে তাকে রামপুরা এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পরদিন তিনি বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তের দায়িত্ব পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রহণ করে। তদন্ত তদারক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন তখনকার এডিসি কায়সার রিজভী কোরায়েশী এবং তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই মাসুদুল ইসলাম।

তদন্তে উঠে আসে আরও বিস্ময়কর তথ্য। রোমান মিয়া অপহরণ ও ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে পুলিশের একটি চক্র জড়িত ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এই মামলার তদন্তে একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয় এবং তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপট আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন একই চক্রের সঙ্গে সিআইডির তৎকালীন এসআই আকসাদুদ–জামানের নামও সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি পরবর্তীতে নিজেও একই ধরনের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর মালিবাগ এলাকায় সিআইডি কর্মকর্তা আকসাদুদকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে রোমান মিয়া মামলার সঙ্গে জড়িয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন কায়সার রিজভী কোরায়েশী ও তাঁর দলের সদস্যরা আকসাদুদ–জামানের কাছ থেকে অর্থ দাবি করেন। পরে তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে চাপ সৃষ্টি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ওই ঘটনায় মোট প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এর মধ্যে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা সরাসরি এবং পরবর্তীতে আরও ১৪ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে আকসাদুদ–জামানের স্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কথোপকথন শোনা যায়। অডিওটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং পুলিশের ভেতরের অনিয়ম নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে।

ঘটনার প্রায় এক বছর পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে জানা যায়। সেই সময় কায়সার রিজভী কোরায়েশীকে সাময়িক বরখাস্ত না করে বদলি করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) উত্তরার সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তাঁর দলের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

বর্তমান বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কায়সার রিজভীর নেতৃত্বাধীন দলটি সম্মিলিতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং পুরো টিমের কার্যক্রমের দায়ভার বহন করেন। তদন্তকারীদের মতে, এটি ছিল একটি সংগঠিত অপব্যবহার ও পরিকল্পিত অসদাচরণের ঘটনা, যেখানে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে অদক্ষতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এই বিধিমালার আওতায় সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

তাঁর দলের সদস্যদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন মাত্রার শাস্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একজন পরিদর্শকের এক বছরের পদোন্নতি স্থগিত, আরেকজনের এক বছরের ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকজন এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলের বিরুদ্ধে স্বল্পমেয়াদি বেতন কর্তনের শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই পুরো ঘটনার দায় এককভাবে কায়সার রিজভীর ওপর বর্তায় না বরং তাঁর নেতৃত্বাধীন টিম সমষ্টিগতভাবে দায়ী। তবে নেতৃত্বের কারণে মূল দায় তাঁর ওপরই বর্তায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনায় আইনগত দিক নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী মন্তব্য করেছেন, বিষয়টি কেবল বিভাগীয় শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয় বরং এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। তাঁর মতে, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, যার জন্য মামলার মাধ্যমে বিচার ও কারাদণ্ড হওয়া উচিত।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্ত প্রতিবেদনটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পুলিশ সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে এবং সেখান থেকেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে।

এই ঘটনার সঙ্গে আরও একটি প্রেক্ষাপট যুক্ত হয়, যখন রোমান মিয়া নামের এক প্রবাসীকে অপহরণ ও ডাকাতির ঘটনায় আলাদা একটি মামলা চলমান ছিল। ওই মামলার তদন্তেও একই চক্রের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে দেখা যায়, এই মামলার তদন্ত ঘিরে পুলিশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগও তৈরি হয়। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দায়ী করে অভিযোগ করে, ফলে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করে।

বর্তমানে কায়সার রিজভী কোরায়েশী আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে কর্মরত আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের এই সুপারিশ এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে তাঁর চাকরির ভবিষ্যৎ।

সব মিলিয়ে, এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত শাস্তির বিষয় নয় বরং পুলিশের ভেতরে ক্ষমতার অপব্যবহার, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে এবং প্রশাসনিক মহলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

প্রধান খবর

গুলিতে নিহত যুবদল কর্মী/ কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশাতেই হত্যার নীল নকশার অভিযোগ

গত শুক্রবার ২৪ জুলাই রাজধানীর মিরপুরের কাফরুল এলাকায় গুলি করে যুবদলের কর্মী ইউসুফকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার পরবর্তী এক সংবাদ সন্মেলনে পুলিশের পক্ষ থেকে এলাকা আধিপত্য ও

চট্টগ্রাম নগরের আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার

মুনতাসীর মামুন : চট্টগ্রাম নগরের আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বুধবার (২৯ জুলাই) যশোরের ঝিকরগাছা সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইমনের গ্রেপ্তারের বিষয়টি

কমলাপুর রেলস্টেশনে নিয়মিত যৌথ অভিযান চালাবে র‍্যাব ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ

মুনতাসীর মামুন : টিকিট কালোবাজারি, মাদক ও চোরাচালান বন্ধে টাউনহল সভায় সিদ্ধান্ত রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন ও আশপাশের এলাকায় টিকিট কালোবাজারি, মাদক ও চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে নিয়মিত যৌথ অভিযান চালাবে

আসছে...