অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
সুনামগঞ্জের কলেজছাত্র শাকিল আহমেদের ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় ভয়াবহ মানবেতর অভিজ্ঞতায়। দালালের প্রলোভনে ২০২৩ সালে গ্রিসে পাঠানোর আশায় তিনি ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। দুবাই ও মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তার সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় না; বরং তিনি মানবপাচার চক্রের কবলে পড়ে যান।
লিবিয়ায় পৌঁছে শাকিলসহ আরও শতাধিক বাংলাদেশি আটকা পড়েন। এক বছরেরও বেশি সময় সেখানে বন্দিজীবন কাটাতে হয় তাকে। আধপেটা খেয়ে দিন কাটানো, সীমিত খাবার ও পানির মধ্যে মানবেতর জীবন ছিল তার বাস্তবতা। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় ২০২৪ সালের শেষ দিকে দেশে ফেরেন তিনি।
শাকিলের পরিবারের অবস্থাও ছিল সংকটপূর্ণ। মা ও বোন আত্মীয়দের কাছ থেকে ধারদেনা করে দালালকে টাকা দিয়েছিলেন। সেই অর্থ আর ফেরত পাননি তারা, বরং এখনো ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে।
শাকিলের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন বাংলাদেশিরা। একই ধারা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
লিবিয়ায় অবস্থানকালে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে প্রায়ই আটক, নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠছে। অনেককে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে গিয়ে পরে বন্দি করে রাখা হয়। আবার অনেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান।
সম্প্রতি গ্রিসে একটি নৌকা পৌঁছানোর পর জানা যায়, লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালেই হাজার হাজার বাংলাদেশি এই বিপজ্জনক পথে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন বলে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানবপাচার চক্র অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত। দালাল চক্র বাংলাদেশ থেকে শুরু করে লিবিয়া ও ইউরোপ পর্যন্ত সক্রিয়। তারা উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে ইউরোপে গেছেন, যাদের বড় অংশই দেশের দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে। ব্র্যাকের গবেষণাতেও দেখা গেছে, ইউরোপে যাওয়ার আগে অধিকাংশ মানুষকে ভালো চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও লিবিয়ায় পৌঁছে তারা চরম প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হন।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দালাল চক্রকে চিহ্নিত করে মামলা করা হচ্ছে এবং সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দেশীয় উদ্যোগ নয়, আন্তর্জাতিক সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন ও মানবপাচার বন্ধ করা কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন এখন অনেকের জন্যই পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে—যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশিরাই।



