পরীক্ষামূলক সংস্করণ

অপ্রতিম হত্যার নেপথ্যে আইফোন, ৫ হাজার টাকার পাওনা ও ‘অসম বন্ধুত্ব’

১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের নেপথ্যে কেবল আইফোন ছিনতাইয়ের লালসাই ছিল না, বরং এর সঙ্গে যুক্ত ছিল পাঁচ হাজার টাকার পাওনা নিয়ে ক্ষোভ এবং বয়সে বড়দের সঙ্গে একটি ‘অসম বন্ধুত্ব’।

কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে তার মায়ের ব্যবহৃত আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার দিন অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন অপ্রতিমের মুঠোফোনে বারবার বার্তা পাঠায় এবং দামি ফোনটি দিয়ে টিকটকের জন্য ছবি ও ভিডিও বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাকে বাসা থেকে ডেকে আনে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বেলা ৩টা ১০ মিনিটের দিকে তুহিন ও অপ্রতিম পাশাপাশি হেঁটে পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে এবং তাদের পেছনে আরও দুই কিশোর অনুসরণ করছে। তারা অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরের এক নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যায়।

বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে নির্জন জঙ্গলে অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে সে তীব্র বাধা দেয়। এ সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় সজোরে আঘাত করে এবং পরবর্তীতে সঙ্গে থাকা অন্য কিশোররাও তাকে আঘাত করে। মাথার গুরুতর আঘাতে ঘটনাস্থলেই অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তারা ফোনটি নিয়ে পালিয়ে যায়। তদন্তের আরেক পর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মুঠোফোনের দোকান ‘ইয়েসটেক’-এ কাজ করা ১৫ বছর বয়সী এক গ্রেপ্তারকৃত কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। অপ্রতিম সম্প্রতি ওই টাকা ফেরত চাওয়ায় ওই কিশোর তার ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা শোধ করতে হবে না—এমন ভাবনা থেকে সেও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পরদিন শনিবার সকাল ৯টার দিকে পুলিশ তুহিনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। প্রথমে অস্বীকার করলেও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৮টার দিকে তুহিন হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। তবে অন্যদের নাম প্রকাশ না করার বিষয়ে সে ‘ওয়াদাবদ্ধ’ বলে জানায়। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালে তুহিনের ফোনে বারবার অপ্রতিমের বাবার দোকানের সেই কিশোরের কল আসতে থাকলে পুলিশ তাকেও আটক করে। আটকের সময় ওই কিশোরের গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। তাকে আটকের পর তুহিনের দেওয়া তথ্যে আরেক কিশোরকেও পুলিশ হেফাজতে নেয়। পুলিশ পরে তুহিনের বাড়ি থেকে বিছানার তোশকের নিচে লুকিয়ে রাখা অপ্রতিমের আইফোনটি উদ্ধার করে।

এই ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা হত্যা মামলা দায়ের করলে পুলিশ তুহিনসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করে, যাদের মধ্যে দুজন কিশোর। অপ্রতিমের সাথে অভিযুক্তদের বয়স ও সামাজিক ব্যবধান থাকলেও তাঁদের একসঙ্গে ছবি তোলা, মেলামেশা ও টিকটক ভিডিও তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে, যাকে তদন্তকারীরা ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, ঘটনাটির সাথে কিশোর অপরাধ চক্র বা গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সারা দেশে ব্যাপক শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মায়ের আকুল প্রশ্ন “তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন?” এবং বাবার কান্না “আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়” সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। রোববার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মাঠ ও ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে অপ্রতিমের দাফন সম্পন্ন হয়।

সম্পর্কিত বিষয়:

প্রধান খবর

অপ্রতিম হত্যার নেপথ্যে আইফোন, ৫ হাজার টাকার পাওনা ও ‘অসম বন্ধুত্ব’

আইফোন ছিনতাই ও পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধের জেরে কুমিল্লার ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। টিকটক ভিডিও বানানোর প্রলোভনে লালমাই পাহাড়ে নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায় তুহিন ও তার সহযোগীরা। ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

মরিয়মের মৃত্যু: আনুষ্ঠানিকতা শেষে সকালে এমপি গাজী নজরুল ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখাবে পুলিশ

রাজধানীর ন্যাম ভবনে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্ররোচনার অভিযোগে মামলায় এমপি ও তাঁর প্রথম স্ত্রী পুলিশ হেফাজতে আছেন। ময়নাতদন্ত ও তদন্ত শেষে মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।

আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী গ্রেপ্তার

আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। নিহতের বাবা বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় এই মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

আসছে...