জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে দেশের বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এরই মধ্যে প্লাস্টিক পণ্যের দাম ৪ থেকে ৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ন্যাশনাল পলিমার। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিল্পের উদ্যোক্তারা।
প্লাস্টিকের পাইপ ও ফিটিংস, দরজা ও আসবাবসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে ন্যাশনাল পলিমার। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যালের দাম বৃদ্ধি এবং দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের দাম ৪ থেকে ৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ন্যাশনাল পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিয়াদ মাহমুদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পেট্রোকেমিক্যালের দাম ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ট্রাকের ভাড়াও বেড়েছে। পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালানোর খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
তিনি আরও জানান, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এই পরিস্থিতিতে দাম বাড়ানো হলে বিক্রি আরও ৭ থেকে ৮ শতাংশ কমে যেতে পারে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্লাস্টিক পণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পে ইতিমধ্যে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। এই বাড়তি ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে এবং পণ্যের দাম কতটা বাড়ানো প্রয়োজন, তা নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। তাঁদের ধারণা, খুব শিগগির প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, রড, সিমেন্ট, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
বিভিন্ন শিল্পের ১০ জন উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের মধ্যে বিশেষ করে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বাড়বে। পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণত বিক্রি কমে যায়। আবার বিক্রি কমলে উৎপাদনও কমাতে হয়। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্য বিক্রির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তাঁরা।
গত রোববার রাতে সরকার দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। পেট্রলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা।
এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এরপর গত জুনে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা
মোড়কজাত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে সাধারণত উৎপাদকেরা দুইভাবে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। পণ্যের দাম বাড়ানো অথবা একই দামে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া। তবে এবার জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে ৫ ও ১০ টাকার মতো কম দামের ছোট প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না বলে মনে করছেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে খুচরা দোকানদার ও ডিলারদের মার্জিনও বাড়াতে হবে। ফলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়বে। দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বিক্রি কমে যাবে এবং ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
কম দামের মোড়কজাত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানো হবে নাকি প্যাকেটের পরিমাণ কমানো হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিমাণ কমাতে কমাতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন আরও কমালে হয়তো প্যাকেটে কিছুই থাকবে না। তাই দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
অন্যদিকে, আরেকটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে তাদের ব্যয় কতটা বাড়ছে, তা পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের পণ্যের মধ্যে রয়েছে আটা, ময়দা, সুজি, লবণ, মসলা ও কনফেকশনারি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা (সিবিও) কামরুল হাসান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দাম বাড়ে। তাঁরা সাধারণত পরিস্থিতি অত্যন্ত চাপের পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়ান না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হতে পারে।
টনপ্রতি রড উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে ১,২০০ টাকা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রড, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রীর দামও বাড়তে পারে। এতে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে চলমান মন্দাভাব আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সুমন চৌধুরী বলেন, তাঁদের ধারণা অনুযায়ী রড উৎপাদনের ব্যয় প্রতি টনে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনেও। নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে তৈরি পোশাক পরিবহনে একটি কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া গত সপ্তাহ পর্যন্ত ছিল প্রায় ১৫ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সেই পরিবহন ব্যয় বেড়ে ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা হয়েছে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কাঁচামাল আমদানি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন চালু রাখতে জেনারেটরের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দামও বাড়বে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে এবং একপর্যায়ে তাঁরা মজুরি বাড়ানোর দাবি তুলতে পারেন। সব মিলিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তদারকির পরামর্শ
নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাজার তদারকি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি কিছুটা যৌক্তিক। তবে কোনো পণ্যের দাম কতটা বাড়ানো হচ্ছে, সেটি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে তদারকি করতে হবে।
একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে এলে দেশের বাজারেও তার যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা সরকারের থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। উৎপাদন, কাঁচামাল, বিদ্যুৎ ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ায় বিভিন্ন শিল্পপণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে উৎপাদকদের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি ও বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।



