জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে চলমান একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আপত্তি জানানো ও কিছু নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে নেওয়ার পরও একই ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে।
উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তর ভাবকি গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫ মিটার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইটের খোয়া, গুঁড়া ইট, রাবিশ ও মাটিযুক্ত খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে আপত্তি জানালে কিছু নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে নেওয়া হলেও পরে আবার একই ধরনের উপকরণ এনে কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি নিম্নমানের ইটবোঝাই একটি ট্রাক ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকেরা নির্মাণকাজ করছেন। রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা ইটের খোয়ার মধ্যে ভাঙা, মাটিযুক্ত ও পোড়ামাটির মতো দেখতে ইটের টুকরা রয়েছে। কোথাও কোথাও বড় আকারের ইটের টুকরাও দেখা যায়।
নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রায় ৫০ মিলিমিটার বা ২ ইঞ্চি আকারের ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও কোনো কোনো স্থানে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি আকারের বড় ইটের টুকরা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব উপকরণ দিয়ে সড়কের মেকাডম বা বেজ তৈরির কাজও করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের শিডিউল অনুযায়ী মাটি ভরাট, বেড প্রস্তুত, বক্স কাটিং, এজিং, ক্যাম্বারিং, বালু ভরাট, ব্রিক ফ্ল্যাট সলিং, হেরিং বোন বন্ড ও প্যালাসাইডিংসহ বিভিন্ন কাজ যথাযথভাবে করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের আগে গুণগতমান পরীক্ষা করার কথা থাকলেও নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, সড়কের বেড তৈরিতে ১, ২ ও ৩ নম্বর ইটের খোয়ার পাশাপাশি গড়াই ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ইট সামান্য চাপ দিলেই গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ইটের গুঁড়া ও রাবিশজাতীয় উপকরণও মেশানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এ ছাড়া সড়কের কাজে ছয় ইঞ্চি বালু দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো অংশে মাত্র এক ইঞ্চির মতো বালু দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল বলেন, কাজের মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। অভিযোগের পরও কাজ বন্ধ হয়নি। নিম্নমানের ইটের সঙ্গে রাবিশ ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
উত্তর ভাবকি গ্রামের বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, নিম্নমানের ইট ব্যবহার না করার জন্য ঠিকাদারকে একাধিকবার বলা হয়েছে। এমনকি নিম্নমানের ইটবোঝাই একটি ট্রাক ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও একই ধরনের উপকরণ দিয়ে কাজ চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সোনিয়া আক্তার বলেন, তারা প্রায় ৪০ বছর ধরে এলাকায় বসবাস করছেন। এত বছর পর রাস্তা নির্মাণ হলেও কাজের মান নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন।
সাইদুল ইসলাম বলেন, এক কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের সড়কে নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হলে এর স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। দ্রুত রাস্তা নষ্ট হলে ভবিষ্যতে সরকারি অর্থে আবার সংস্কারের প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, সড়কের কাজে নিম্নমানের কোনো নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে না। কোনো উপকরণের মান নিয়ে স্থানীয়দের আপত্তি থাকলে প্রয়োজনে তা সরিয়ে নতুন উপকরণ দিয়ে কাজ করা হবে।
এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর বলেন, কাজের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। সাইটে তদারকির জন্য সাইট ইঞ্জিনিয়ার থাকেন। কেউ অভিযোগ করলে নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কালাই উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী আনা হলে তা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বিল দেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তর ভাবকি গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫ মিটার সড়কটি পিচঢালাইয়ের উপযোগী করতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। জয়পুরহাটের রাবা কনস্ট্রাকশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছে। গত বছরের মে মাসে কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের মার্চে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় আরও তিন মাস সময় বাড়ানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।



