ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ১৩ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁর পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তদন্তভার পুলিশ থেকে সিআইডিতে হস্তান্তর এবং পরে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত সাজিদের মোবাইল ফোনের লকও দীর্ঘ সময়েও খোলা যায়নি বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সাজিদ আব্দুল্লাহ আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হলের সামনের পুকুর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ১৮ জুলাই সকাল সাড়ে ৯টায় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে তাঁর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
পরে প্রকাশিত ভিসেরা ও ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে সাজিদকে শ্বাসরোধ করে হত্যার তথ্য উঠে আসে। ভিসেরা প্রতিবেদনের বরাতে তাঁর মৃত্যুর সময় ১৬ জুলাই রাতের দিকে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি পরে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রথমে মামলাটির তদন্ত করেন ইবি থানার ইন্সপেক্টর আবদুল্লাহ আল মামুন। পরে পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তভার কুষ্টিয়া সিআইডির ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে সাইফুল ইসলামকে পরিবর্তন করে কুষ্টিয়া সিআইডির ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেনকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়।
তবে ১৩ মাস পরও মামলায় কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সাজিদের মোবাইল ফোনের লক খোলা না যাওয়ার বিষয়টিও তদন্তের অন্যতম আলোচিত দিক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় তদন্তের পরও মোবাইল ফোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধারের বিষয়টি অনিশ্চিত রয়েছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ড নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যাকাণ্ডের রাতে সাজিদের কক্ষ সিলগালা করার পর সেখানে প্রবেশের অভিযোগ, হলের সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে প্রশ্ন, হত্যাকাণ্ডের রাতে মেইন গেট দিয়ে কয়েকজনের প্রবেশ, সাজিদের মৃত্যুর পর তাঁর মোবাইলে কল রিসিভ হওয়ার দাবি, মোবাইল ফোনের লক দীর্ঘদিনেও খুলতে না পারা এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইনসানের ফোন ক্লোনের অভিযোগ।
এসব বিষয়ে তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। সাজিদের সহপাঠী মোজ্জামেল হোসেন বলেন, এখনো অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময়েও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে না পারাকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিআইডির গাফিলতি হিসেবে দেখছেন।
সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ বলেন, তাঁর ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই বলেও জানান তিনি। তবে সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও মামলার বিষয়ে কোনো আপডেট পান না বলে জানান। তাঁর কাছে সিআইডি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—উভয়েরই গাফিলতি মনে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেন বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তদন্তের কাজে কয়েকবার ক্যাম্পাসে গেছেন এবং কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না বলে জানান তিনি। একই ধরনের বক্তব্যে তিনি অন্য এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তদন্ত চলমান থাকার কথা জানিয়েছেন।
সাজিদ হত্যার বিচার দাবিতে গত এক বছরে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাঁর হত্যার এক বছর পূর্তিতেও পরিবার ও শিক্ষার্থীরা দ্রুত বিচার ও তদন্তের অগ্রগতির দাবি জানান।
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তাঁর দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও ব্যস্ত থাকায় সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



