কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে মৃত্যুর আগের রাতে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামা, কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যাওয়া এবং পরে ওই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করেছে পুলিশ। তবে অটোরিকশাটির সঙ্গে তাজমিনের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর সে হোটেলের পশ্চিম পাশে অবস্থিত কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায়। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় তাকে। এ সময় দোকানিকে তাজমিনকে কিছু দেখাতে বা কোনো দিক নির্দেশ করতে দেখা যায়।
ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখানোর পর সেখান থেকে সরে অন্য পাশে যায় তাজমিন। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। তবে ওই এলাকা থেকে বের হওয়ার পর সে কোন পথে গিয়েছিল, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তাজমিনের পরবর্তী চলাচলের পথ এবং সম্ভাব্য যাতায়াতের মাধ্যম শনাক্ত করতে কাজ করছেন তদন্তকারীরা।
তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়েছে। এ কারণে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে তাজমিন কোনো অটোরিকশায় উঠেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। জব্দ করা অটোরিকশাটি নিবন্ধিত বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। তবে গাড়িটির সঙ্গে তাজমিনের যাতায়াতের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় বেড়ে ওঠা তাজমিন স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়তনে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত।
পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা যায়, চার দিন আগে এক বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যায় তাজমিন। পরে ওই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়। রাতে তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল করেন। কিন্তু ফোন রিসিভ না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
পুলিশের অনুসন্ধানে তাজমিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। তবে এসব স্থানে তার সঙ্গে অন্য কেউ ছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর সে কোথায় গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং জব্দ করা অটোরিকশাটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয়কে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে তাজমিনকে পড়িয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তাজমিন খুব চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা কিছুটা অসুস্থ থাকায় দুই যমজ ভাইয়ের দেখভাল করত সে। তাজমিনের বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং কাজের কারণে সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন বলে জানান ওই শিক্ষক।
সাদ বিন এরশাদ আরও বলেন, ঘরে রাগ হলে তাজমিন হুটহাট করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, তাজমিনের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং কাছাকাছি স্থান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন ছিল না; তবে গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানান তিনি।
মোস্তাইন বিল্লাহ্ আরও বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি নিবন্ধিত। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুলিশ কাজ করছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তাজমিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা এবং মৃত্যুর আগের রাতে তার চলাচলের বিস্তারিত জানতে সিসিটিভি ফুটেজ, জব্দ করা অটোরিকশা ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।



