ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নারী রয়েছেন। এসব হামলায় আহত হয়েছেন ১২ জনের বেশি। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকা এবং উপত্যকার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে চালানো এসব হামলার তথ্য চিকিৎসাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। একই দিনের হামলায় সাতজন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে আয়ারল্যান্ডের সম্প্রচারমাধ্যম আরটিইও।
বৃহস্পতিবার গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া, আল-তাওয়াম ও আমের প্রজেক্ট এলাকা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-সুদানিয়া, রাফাহর উত্তর-পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এবং খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এসব ঘটনায় যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও গোলাবারুদ ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। নিহত সাতজনের মধ্যে ছয়জন গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসাসূত্র জানায়, গাজা সিটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল-তাওয়াম এলাকার মিসরীয় ক্যাম্পে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেওয়া একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় আহত মোহাম্মদ রাজাব ওয়ারশ আগা পরে মারা যান। ওই হামলায় আহতদের মধ্যে দুজনকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উত্তরাঞ্চলীয় মাঠ হাসপাতালের এক চিকিৎসক। তাঁদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল।
গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক নারী ও এক শিশু নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন। এর আগে ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উত্তরাঞ্চলীয় মাঠ হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, ওই হামলায় দুজন আহত হয়েছেন এবং তাঁদের একজনের অবস্থা গুরুতর।
গাজা সিটির দক্ষিণাঞ্চলের তাল আল-হাওয়া এলাকায় একটি বেসামরিক গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন তিনজন। আহত ব্যক্তিদের একজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের আল-শিফা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম গাজা সিটির আমের প্রজেক্ট এলাকায় একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে আহলাম মুবারক (৩০) নামের এক ফিলিস্তিনি নারী নিহত হন। ওই তাঁবুতে বাস্তুচ্যুত একটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। হামলায় তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান আহত হয়েছেন। আল-শিফা হাসপাতালের এক চিকিৎসক তাঁর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেন। আহত স্বামীর অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে গাজা সিটিতে একটি গাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আহত আহমেদ খামিস আবু নাজা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ফলে আগের হামলায় আহত ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাও বৃহস্পতিবারের হতাহতের হিসাবে যুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গাজা সিটির উপকূলে ফিলিস্তিনি নৌযান ও উপকূলীয় এলাকার দিকে ইসরায়েলি নৌবাহিনী গুলি ও গোলাবর্ষণ করেছে। উপত্যকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-সুদানিয়া এলাকাতেও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ গাজার রাফাহর উত্তর-পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি বাড়িতে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে সাতজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান করা এলাকাগুলোতে আবাসিক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বানি সুহেইলা গোলচত্বরের কাছে ইসরায়েলি সেনাদের ছোড়া ধোঁয়া বোমা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের কয়েকটি তাঁবুতে আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৭ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ৪৬৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ১৬১ জন আহত হয়েছেন। একই প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে মোট নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ২৫০ এবং আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হিসাবের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।
২০০৭ সাল থেকে গাজা উপত্যকায় স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে কঠোর অবরোধ বজায় রেখেছে ইসরায়েল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। এরপর থেকে উপত্যকাটিতে ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজায় নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। উপত্যকার বহু আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মরদেহ উদ্ধার এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ চলতে থাকায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
গাজায় সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। অন্যদিকে, গাজায় গণহত্যার অভিযোগে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলার শুনানি চলছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে)। এসব আইনি প্রক্রিয়া পৃথক এবং অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি ও পরোয়ানা জারির বিষয়কে এক করে দেখা উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে যুদ্ধবিরতি ও গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার কাঠামো নিয়ে আলোচনা চললেও নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের পরও গাজায় প্রাণহানি ও হামলার খবর অব্যাহত রয়েছে।



