চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও মেঘনা নদীতে মাছ শিকার ও নদীতীরবর্তী বাজারগুলোতে ইলিশ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রাতের বেলা নদীতে জাল ফেলে মাছ শিকার করা হচ্ছে, আর ভোর থেকে বিভিন্ন বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে সেই মাছ। এ ছাড়া নদীতে মাছ ধরার সুযোগ পেতে মৎস্য বিভাগ ও নৌ-পুলিশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থ দিয়ে নৌকাপ্রতি ১৫ হাজার টাকায় ‘টোকেন’ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন জেলে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ সরাসরি বক্তব্য দেননি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ষাটনল থেকে আমিরাবাদ পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার নদীপথ এবং উপজেলার বিভিন্ন মাছের বাজারে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার ও বিক্রি চলছে। তাঁদের অভিযোগ, দিনের বেলায় প্রশাসনের অভিযান থাকলেও সন্ধ্যার পর নদীতে নজরদারি কমে যায়। এ সুযোগে জেলেরা নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন। রাতভর মাছ শিকারের পর ভোরে নদীতীরবর্তী বাজারগুলোতে তা বিক্রি করেন।
ষাটনল এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, বাবুবাজারের মৎস্য আড়ত ও বাহাদুরপুর এলাকায় ফজরের নামাজের পর থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত জাটকা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির নদীর মাছ বিক্রি হয়। তাঁর দাবি, এ সময় প্রশাসনের তৎপরতা তেমন একটা দেখা যায় না।
আমিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান ও তোফায়েল আহমেদ বলেন, দুপুর ১২টার পর আমিরাবাদ বাজারের নদীতীরে ত্রিপল টাঙিয়ে প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি করা হয়। কয়েক শ পাইকার সেখান থেকে মাছ কিনে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান। তাঁদের দাবি, ওই বাজারে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা হয়।
এ ছাড়া এখলাসপুর, মোহনপুর, দশআনী, মুক্তির পল্লী ও জনতার বাজার এলাকায়ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মাছ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। মেঘনার পশ্চিম পাড়ের বেরচর, চর উমেদ, নাছিরারচর ও বাহেরচর এলাকাতেও প্রকাশ্যে মা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কয়েকজন জেলের অভিযোগ, মৎস্য বিভাগ ও নৌ-পুলিশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সমঝোতা করে নৌকাপ্রতি ১৫ হাজার টাকা দিয়ে তাঁরা ‘টোকেন’ নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, টোকেন ছাড়া নদীতে মাছ ধরতে নামলে মামলা ও জরিমানার মুখে পড়তে হয়। তবে অর্থ লেনদেনের এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আমিরাবাদ মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক দেলু বেপারী বলেন, মাছ ধরা বন্ধ থাকলে জেলেদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁরা আর্থিক সংকটে রয়েছেন এবং মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করেন। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বিষয় সামলে বাজারের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানান তাঁরা।
মোহনপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. রুহুল আমিন বলেন, মতলব উত্তরের মেঘনা নদীর অংশে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আইন অমান্য করে অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মতলব উত্তর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা স্বপন চন্দ্র দে বলেন, সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও নৌ-পুলিশের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান চলছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু অসাধু চক্র নদীতে জাল ফেলছে এবং বিভিন্ন স্থানে মাছ বিক্রি করছে। এসব অনিয়ম বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, জনবলসংকটের কারণে সব এলাকায় একসঙ্গে অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এ বছর নদীতে মাছ ধরতে নামা জেলেদের মধ্যে অনেকেই মারমুখী আচরণ করছেন। অল্পবয়সীদেরও মাছ ধরতে নামানো হচ্ছে। তাদের বয়সের কারণে আইনগত ব্যবস্থা নিতে জটিলতা দেখা দেয়। তবে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
চাঁদপুর নৌ অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান জানান, মা ইলিশ রক্ষায় মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা জানালেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতে মাছ শিকার ও দিনের বেলায় প্রকাশ্যে বেচাকেনা বন্ধ হচ্ছে না। জনবলসংকট, নজরদারির ঘাটতি এবং অর্থের বিনিময়ে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে মা ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, রাতের টহল জোরদার এবং নিষিদ্ধ সময়ে মাছ বিক্রির বাজারগুলোতে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। তবে অর্থের বিনিময়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন।



