অল ক্রাইমস.টিভি ডেস্ক
চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম এখন কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে চরম আতঙ্ক, থমথমে পরিবেশ এবং শিক্ষাকার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ক্লাস ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, আর ক্যাম্পাসে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ২০ এপ্রিল, কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে জুলাই আন্দোলন স্মরণে আঁকা একটি গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে। ওই গ্রাফিতিতে লেখা ছিল “ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস”। অভিযোগ ওঠে, ছাত্রদলের একাংশ সেই লেখার ‘ছাত্র’ শব্দ মুছে সেখানে ‘গুপ্ত’ লিখে দেয় এবং ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এতে ছাত্রশিবিরের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং মুহূর্তেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
পরদিন ২১ এপ্রিল দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রথম দফা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। পুলিশ দ্রুত এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর নিউমার্কেট এলাকায় ছাত্রশিবিরের একটি প্রতিবাদ মিছিলকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ছাত্রদলের বাধার মুখে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ শুরু হয়, যা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে। এ সময় বহিরাগতদের অংশগ্রহণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
সংঘর্ষ চলাকালে ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই পক্ষই সংঘর্ষে সংঘবদ্ধভাবে অংশ নেয়, যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এ ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হন। গুরুতর আহতদের মধ্যে একজনের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বলে জানা গেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আহতদের কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনার পরপরই কলেজ কর্তৃপক্ষ জরুরি সিদ্ধান্ত নিয়ে সব ধরনের ক্লাস ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করে। শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নির্ধারিত কিছু পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কলেজ প্রশাসন জানায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু ছালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুতই ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরবে।
বর্তমানে কলেজ ক্যাম্পাসে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মূল ফটকসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। শিক্ষার্থী ও কর্মীদের পরিচয় যাচাই করে প্রবেশ করানো হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী আতঙ্কে নিয়মিত ক্লাসে আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
ঘটনাটি শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির উভয়ই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করেছে। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ ও আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় সংসদেও উত্তেজনা দেখা দেয়। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা একে অপরকে দায়ী করে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য আরও তীব্র আকার ধারণ করে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই নাম প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ আরও জানিয়েছে, জড়িতদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে।



