শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের সমস্যা সমাধানের দাবিতে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেশটির শত শত স্কুলে অবরোধ কর্মসূচিও পালন করেন বিক্ষোভকারীরা।
সকালে মার্সেই, নান্তেস ও লিওঁসহ বিভিন্ন শহরে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থী সংগঠন ল ইউনিয়ন এটুডিয়ান্টের তথ্য অনুযায়ী, মার্সেই, নিস, নান্তেস, লিয়োঁ ও প্যারিসসহ ৩০টির বেশি শহরে বিক্ষোভ চলছে। পরে রাজধানী প্যারিসে বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিক্ষোভে তরুণেরা ধোঁয়ার ফ্লেয়ার ও বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করেন। প্ল্যাকার্ডে স্কুলের সংকট ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে নানা স্লোগান লেখা ছিল। লিলি শহরে ময়লার ডাস্টবিনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
গত দুই সপ্তাহ ধরে প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত উপশহরগুলো থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করেছে। সরকারের দাবি, আন্দোলনের কিছু অংশ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
এর মধ্যে সোমবার উত্তর ফ্রান্সে একটি উচ্চবিদ্যালয়ের বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে। পাস-দ্য-ক্যালাইসের প্রিফেক্ট ফ্রাঁসোয়া-জাভিয়ের লাউশ জানান, ওই সময় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ছিল।
আঞ্চলিক সংবাদপত্র ‘লা ভোয়া দ্যু নর্ড’ জানিয়েছে, পুলিশের ছত্রভঙ্গ করার কাজে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেড ওই কিশোর তুলে নেওয়ার পর বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তার হাত ও বাহুর নিচের অংশের কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠনের দাবি, ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি উচ্চবিদ্যালয় অবরোধ করা হয়েছে অথবা দিনের জন্য বন্ধ রাখা হবে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। কিছু স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করেছে।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত স্কুলের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা এবং মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময় বাড়ানো।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পূরণে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি পুরোনো ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবন মেরামতের বিষয়টি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দিতে মন্ত্রীদের বলা হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের জোগান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজেট ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে ফরাসি সরকার। একই সঙ্গে দেশের ক্রমবর্ধমান ঋণ, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয় কমানোর সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ৬ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম চলছে, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নুর কার্যালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষে অন্তত ৭১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ২১৫ জন কিশোর-কিশোরী আহত হয়েছেন।
এদিকে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ছে। ম্যাখোঁর সরকার ও ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি পার্টি কট্টর বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবাউডের (এলএফআই) আইনপ্রণেতা ও মেয়রদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ করেছে। তবে এলএফআই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্যারিসের দরিদ্র উপশহর সাঁ-দেনির এলএফআই মেয়র বালি বাগায়োকো সহিংসতার বিরোধিতা করার কথা জানিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।



