রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডিএনএ ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামতের সঙ্গে মিলেছে। খেজুরের বিচি, কামড় দেওয়া শসা ও সিগারেটের ফিল্টারসহ বিভিন্ন আলামতে পাওয়া পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল দুই আসামির ডিএনএর সঙ্গে মিলে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।
তিনি জানান, ডিএনএ পরীক্ষায় খেজুর, শসা ও সিগারেটসহ বিভিন্ন আলামতে পাওয়া ডিএনএ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের সঙ্গে মিলে গেছে। এসব আলামতে অন্য কোনো ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চার হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে ৩৫টির বেশি আলামত সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ফল কাটার চাকু, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, নান রুটি, শসা, খেজুর, বেসিনের দাগসহ বিভিন্ন জৈব ও বস্তুগত নমুনা ছিল। এসব আলামতের একটি অংশ ঢাকার সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়।
ঘটনার পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের সঙ্গে তুলনা করার উদ্যোগ নেয় তদন্ত সংস্থা। গত ২১ সেপ্টেম্বর তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য রংপুর কারাগার থেকে ঢাকায় সিআইডি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরীক্ষা শেষে তাদের ডিএনএর সঙ্গে বিভিন্ন আলামতের নমুনার মিল পাওয়া যায়।
এর আগে তদন্তকারীরা জানিয়েছিলেন, ঘটনাস্থলে পাওয়া কামড় দেওয়া শসা, খেজুর ও সিগারেটের অংশ গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। এসব নমুনার ফরেনসিক পরীক্ষার ফলের সঙ্গে আসামিদের ডিএনএ তুলনা করা হয়।
মামলায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তদন্তে তাদের দেওয়া বক্তব্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তের আগের পর্যায়ে পুলিশ জানিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের অবস্থান এবং সেখানে মাদক সেবন নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। পরবর্তী তদন্তে হত্যার পর তাদের বাড়ির ভেতরে অবস্থান এবং সেখান থেকে মালামাল নিয়ে যাওয়ার বিষয়ও সামনে আসে।
নতুন ডিএনএ মিল মামলার ফরেনসিক তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঘটনাস্থলে থাকা খাদ্যদ্রব্য ও ধূমপানের আলামতে দুই আসামির ডিএনএ শনাক্ত হওয়ায় তাদের ঘটনাস্থলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্তে আরও বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া গেল।
তবে ডিএনএ মিলে যাওয়া একাই আদালতে অপরাধ প্রমাণের একমাত্র ভিত্তি নয়। মামলার অন্যান্য আলামত, আসামিদের জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষার ফলও বিবেচনায় আসবে।
উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়া এবং বাড়ি থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়।
পরে এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে।
এর আগে তদন্তের অংশ হিসেবে আসামিদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত ও তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে মামলার তদন্তে আরও কয়েকজন আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
সপরিবারে শিক্ষক হত্যার ঘটনায় রংপুরের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ শুরু থেকেই ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন।



