আমানত সংগ্রহে প্রণোদনার নামে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৪ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) হামিদুর রহমান ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধান দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এ অর্থ উত্তোলন করা হয়। ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে নেওয়া অর্থ ব্যাংকে ফেরত আনার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংকটে থাকা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক আমানত সংগ্রহে বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে ‘উজ্জীবন আমানত ক্যাম্পেইন ২০২৬’ চালু করে। গত ১৫ এপ্রিল মাসব্যাপী এ ক্যাম্পেইনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে ২৭০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে কাঙ্ক্ষিত আমানত সংগ্রহ না হওয়ায় পরে ক্যাম্পেইনের মেয়াদ আরও এক মাস বাড়ানো হয়। তবে মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্ধিত সময়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১০০ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে ব্যাংকটি। এর বিপরীতে ১৩ কর্মকর্তাকে ৪ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। পরে ওই কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে দুই দিনে মোট ১৪টি চেকের মাধ্যমে পুরো অর্থ নগদে উত্তোলন করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল ব্যাংকের প্রধান শাখার সিসিটিভি ফুটেজও পর্যালোচনা করে। ফুটেজ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৪ জুন বেলা পৌনে ১২টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ কোটি টাকা এনে ব্যাংকের ভল্টে রাখা হয়। একই দিন দুপুর দেড়টার দিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে নয়টি চেকের মাধ্যমে ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তোলন করা ওই অর্থ ছয়টি বস্তায় ভরে এমডির পিএস হামিদুর রহমান ও ট্রেজারি বিভাগের প্রধান দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তী কর্মদিবস ৭ জুন আরও পাঁচটি চেকের মাধ্যমে ৯৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। সেদিনও টাকা নিয়ে যান ওই দুই কর্মকর্তা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আমানত সংগ্রহের বিপরীতে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অবগত ছিল বলে দাবি করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হক। তিনি বলেন, ১৩ জন কর্মী গ্রুপ করে ওই আমানত সংগ্রহ করেছেন। তাদের উৎসাহ দিতে প্রণোদনা হিসেবে অর্থ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে জানানো হয়েছে। বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়টি সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে।
প্রণোদনা পাওয়া ১৩ কর্মকর্তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ নিয়েছেন এমডির পিএস হামিদুর রহমান ও এফএভিপি সিদ্দিকুল্লাহ। তারা প্রত্যেকে ৮০ লাখ টাকা করে পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাসনুবা, আহসান হাবিব ও আদনান শফিক পেয়েছেন ৪০ লাখ টাকা করে।
তালিকায় আরও রয়েছেন সালেহ আহমেদ, সরোয়ার, সুজন দাস, দেলোয়ার, মনিরুল, রিফাতুল মুরসালিন, সাইফুর ও শাহিনুর রহমান। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হক দাবি করেছেন, তিনি এ ঘটনায় কোনো সুবিধা নেননি।
নিজের ভূমিকার বিষয়ে ওবায়দুল হক বলেন, পিএস হিসেবে নয়, হামিদুর রহমান মূলত মার্কেটিং বিভাগের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তিনি নিজে কোনো সুবিধা নেননি বলেও দাবি করেন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নৈতিকতার কোনো বিকল্প নেই। কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা আমানত সংগ্রহের নামে অর্থ আত্মসাৎ করলে সেটি গুরুতর অপরাধ এবং এ ধরনের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তদন্ত প্রতিবেদনে ট্রেজারি বিভাগের প্রধান দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগেও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত ছিলেন তিনি। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ থাকার কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আগে দেলোয়ার হোসেনকে বরখাস্তের নির্দেশ দিলেও কমার্স ব্যাংক তা বাস্তবায়ন করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন করে তাকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল হক বলেন, এনআরবিসি ব্যাংক তাকে বরখাস্ত করার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েব পোর্টালে তার নাম প্রকাশ করা হয়। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন। প্রথমে নিম্ন আদালত এবং পরে হাইকোর্ট থেকেও তিনি এ আদেশ পেয়েছেন। ফলে আদালতের আদেশ অমান্য করে ব্যবস্থা নিলে আদালত অবমাননার বিষয় তৈরি হতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, আমানত সংগ্রহ করা ব্যাংক কর্মীদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। এ কাজের জন্য আলাদা করে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু যারা অর্থ পেয়েছেন, তা নয়; যারা প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
প্রণোদনার নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূতভাবে নেওয়া অর্থ ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িত কোনো কর্মকর্তার ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।



